ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের আবাসিক হলে রাতের নির্দিষ্ট সময়ের পর প্রবেশ ও বের হওয়ার বিধিনিষেধ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিনের এই নিয়মকে বৈষম্যমূলক দাবি করে প্রতিবাদ করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা।
‘অবরোধবাসিনী’ নামে একটি ছাত্রী প্ল্যাটফর্ম রোকেয়া হলসহ বিভিন্ন ছাত্রী হলের সামনে পোস্টার ও গ্রাফিতির মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছে। তাঁদের দাবি, সময়ের এই বিধিনিষেধ তুলে দিয়ে ছাত্রীদের চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
এরপর বিভিন্ন হলের আবাসিক ও অনাবাসিক ছাত্রীরা উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি দেন। সেখানে রাতের বিধিনিষেধ শিথিল করা, হলে প্রবেশের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বৈধ পরিচয়পত্র দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো হলে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সান্ধ্য আইন’ বলতে মূলত ছাত্রীদের পাঁচটি আবাসিক হলে রাত ১০টার পর প্রবেশের ওপর থাকা কঠোর বিধিনিষেধকে বোঝানো হয়। নির্ধারিত সময়ের পর হলে ফিরলে অনেক ক্ষেত্রে ছাত্রীদের প্রবেশে জটিলতা তৈরি হয়।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধারণত নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনে এ ধরনের বিধিনিষেধের যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়। কিন্তু ছাত্রীদের প্রশ্ন, নিরাপত্তার নামে যদি রাতের পর হলের গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে বাইরে থাকা একজন শিক্ষার্থীর নিরাপত্তার দায়িত্ব কে নেবে?
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই নিয়ম কি নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীর জন্য সমান? ছেলেদের আবাসিক হলে একই ধরনের কঠোর সময়সীমা না থাকলেও ছাত্রীদের জন্য এমন বিধিনিষেধ কেন থাকবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীরা।
বাংলাদেশের সংবিধানে নাগরিকদের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে এবং লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্য না করার নীতিও রয়েছে। ফলে আবাসিক ব্যবস্থাপনায় নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীদের জন্য ভিন্ন নিয়ম থাকা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের শিক্ষায় অগ্রগতি হলেও উচ্চশিক্ষায় গিয়ে নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কমে যায়। শিক্ষা-সংক্রান্ত পরিসংখ্যানেও উচ্চশিক্ষায় নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে ব্যবধানের চিত্র পাওয়া যায়।
শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াই নয়, উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের ক্ষেত্রেও নারীরা নানা বাধার মুখোমুখি হন। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ কম হওয়ার পেছনে নিয়োগপ্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা, নিরাপত্তা, গণপরিবহনের সংকট, শিশু পরিচর্যার সুযোগের অভাব, পরিবারে অসম দায়িত্ব বণ্টন এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিসহ নানা কারণ রয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে চলাফেরার ওপর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ। পরিবারের পরিধি পেরিয়ে একজন নারী যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান, তখনও যদি তাঁর সময় ও চলাচল নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়, তাহলে তাঁর শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সুযোগও প্রভাবিত হতে পারে।
একজন পুরুষ শিক্ষার্থীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষ হওয়ার পরও দিনের একটি বড় অংশ সক্রিয় থাকে। ক্যাম্পাসে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা, বিতর্ক, সংগঠনের কার্যক্রম, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সিনিয়র-জুনিয়রের সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা বিভিন্ন ধরনের নেটওয়ার্কিং—এসব কর্মকাণ্ড অনেক সময় সন্ধ্যার পরই বেশি হয়।
কিন্তু একই সময়ে ছাত্রীদের জন্য হলের গেট বন্ধ হয়ে গেলে তাঁদের এসব কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়।
এর প্রভাব শুধু সামাজিক জীবনে সীমাবদ্ধ নয়। চাকরির পরীক্ষায় জ্ঞান ও একাডেমিক ফলাফলের পাশাপাশি যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্ব, দলগত কাজ, আত্মবিশ্বাস এবং নেটওয়ার্কিংয়ের মতো দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে এসব দক্ষতা তৈরি হয়।
যদি পুরুষ শিক্ষার্থীরা এসব সুযোগ নিয়মিত পান, কিন্তু নারী শিক্ষার্থীরা সময়ের বিধিনিষেধের কারণে পিছিয়ে থাকেন, তাহলে কর্মজীবনের প্রতিযোগিতায় শুরুতেই একটি কাঠামোগত ব্যবধান তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশে নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ এখনও পুরুষের তুলনায় কম। বিভিন্ন জরিপে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ, কর্মসংস্থান এবং নেতৃত্বের পর্যায়ে নারীর প্রতিনিধিত্বে বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে।
একদিকে নারীরা ঘরের কাজ ও পরিচর্যায় পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি সময় ব্যয় করেন, অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রেও তাঁদের নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে হয়। এর সঙ্গে চলাফেরা ও সামাজিক যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা যুক্ত হলে ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে নারীরা আরও পিছিয়ে পড়তে পারেন।
কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পরও নেটওয়ার্কিং, প্রশিক্ষণ, বৈঠক কিংবা পেশাগত যোগাযোগের অনেক সুযোগ কর্মঘণ্টার বাইরেও তৈরি হয়। ফলে নারীর চলাচলের ওপর সামাজিক বিধিনিষেধ দীর্ঘমেয়াদে তাঁর পদোন্নতি ও নেতৃত্বের সুযোগেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশে ব্যবস্থাপনা ও তত্ত্বাবধায়ক পর্যায়ে নারীর প্রতিনিধিত্বও এখনও তুলনামূলকভাবে কম। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন থেকেই নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
সান্ধ্য আইন সমর্থনের অন্যতম প্রধান যুক্তি হলো নারীর নিরাপত্তা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কি নারীর চলাচল সীমিত করে পালন করা উচিত, নাকি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে?
নারীর ওপর সহিংসতার বড় একটি অংশ ঘর ও পরিচিত পরিবেশের মধ্যেই ঘটে। তাই শুধু বাইরে নারীর চলাচল সীমিত করলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
বরং নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত সড়কবাতি, কার্যকর পুলিশি টহল, নিরাপদ গণপরিবহন, ক্যাম্পাসে জরুরি সহায়তা এবং দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ ও প্রতিকারের ব্যবস্থা।
যদি নিরাপত্তার যুক্তিতে শুধু ছাত্রীদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, অথচ পুরুষ শিক্ষার্থীদের একই ধরনের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা না হয়, তাহলে সেই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
ছাত্রীদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা—দুটিকে পরস্পরের বিপরীত হিসেবে দেখার পরিবর্তে একই সঙ্গে নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
ছাত্রদের হলে যদি রাত ১০টার পর প্রবেশে একই ধরনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা না থাকে, তাহলে ছাত্রীদের ক্ষেত্রেও বৈষম্যহীন নীতি বিবেচনা করা যেতে পারে।
জরুরি পরিস্থিতিতে যেকোনো সময় হলে প্রবেশের সহজ ব্যবস্থা, ডিজিটাল পরিচয় যাচাই, ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা ও চিকিৎসা সহায়তা এবং কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা চালু করা যেতে পারে।
পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীদের চলাচল, পাঠাগার ও ল্যাব ব্যবহারের সুযোগ, সাংস্কৃতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের সান্ধ্য আইনবিরোধী আন্দোলন তাই শুধু একটি হলের গেট কখন বন্ধ হবে—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে উচ্চশিক্ষায় নারীর সমান সুযোগ, সামাজিক স্বাধীনতা, ভবিষ্যৎ কর্মজীবন এবং নেতৃত্বে অংশগ্রহণের বিষয়।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে নারীর চলাচল বন্ধ না করে, বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন যেখানে নারী ও পুরুষ উভয়েই সমানভাবে নিরাপদে শিক্ষা, সামাজিক কর্মকাণ্ড ও পেশাগত প্রস্তুতিতে অংশ নিতে পারেন।