ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লিফটে আগুন লাগার পর আতঙ্কে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে হুড়োহুড়ির ঘটনা ঘটে। এ সময় সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে কয়েকজন পদদলিত হয়ে মারা গেছেন বলে দাবি করেছেন তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন এ ধরনের মৃত্যুর তথ্য অস্বীকার করেছে।
ফুলবাড়িয়া উপজেলার বিষ্ণুরামপুর গ্রামের পল্লিচিকিৎসক শাহাজাহান মনির (৪৫) তাঁদের একজন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন ধরে তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনে যক্ষ্মার চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।
আগুন লাগার সময় স্ত্রী হারিসা বেগম ও তাঁর বড় বোনের সঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলেন শাহাজাহান। হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে পড়ে গিয়ে তিনি পদদলিত হন বলে পরিবারের দাবি। পরে তাঁকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
ছেলের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর থেকে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন তাঁর মা হাওয়া খাতুন। তিনি বলেন, ছেলের সঙ্গে মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগেও তাঁর ফোনে কথা হয়েছিল। ছেলে তাঁকে জানিয়েছিলেন, তিনি ভালো আছেন এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে পরিবারের সবাইকে নিয়ে রান্না করে খাবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছেলে বাড়িতে ফিরলেও ফিরেছে তাঁর মরদেহ।
শাহাজাহানের স্ত্রী হারিসা বেগম জানান, ওষুধ কিনতে তাঁরা দুই বোন বের হওয়ার সময় আগুন লাগার কথা জানতে পারেন। রোগীকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় কয়েক ধাপের মধ্যেই ভিড়ের চাপে তাঁরা পড়ে যান। একপর্যায়ে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। পরে জ্ঞান ফিরে দেখেন চারপাশে মানুষ কান্নাকাটি করছে। তখন জানতে পারেন, তাঁর স্বামী ভিড়ের মধ্যে পিষ্ট হয়ে মারা গেছেন।
হারিসার বড় বোনও ওই ঘটনায় বুকে ব্যথা পেয়ে আহত হয়েছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয়েছে।
একইভাবে পদদলিত হয়ে মারা যাওয়ার দাবি করেছে তারাকান্দার বালিখা গ্রামের কুলসুম আক্তারের (৩৫) পরিবার। কুলসুম প্রায় ১২ দিন ধরে তাঁর ১২ বছর বয়সী ছেলে স্বাধীনকে নিয়ে হাসপাতালে ছিলেন। জন্ডিসে আক্রান্ত স্বাধীন শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ১৮ বছর বয়সী মেয়ে মিম আক্তার।
আগুন লাগার খবর ছড়িয়ে পড়লে কুলসুম তাঁর ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলেন। তখন প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে তাঁরা পড়ে যান। মিম কোনোভাবে তাঁর ভাইকে তুলে আনতে পারলেও মাকে তুলতে গিয়ে বারবার ধাক্কার মুখে পড়েন।
মিমের ভাষ্য, পরে অনেক কষ্টে মাকে নিচে নামিয়ে আনা হয়। কিন্তু হাসপাতালে দ্রুত চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক কুলসুমকে মৃত ঘোষণা করেন। পরদিন সকালে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।
কুলসুমের ননদ নাজমা আক্তার বলেন, কুলসুম ও তাঁর সন্তান দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাই বাইরে থেকে তাঁকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল—হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এমন বক্তব্য সত্য নয় বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, ভিড়ের মধ্যে পড়ে যাওয়ার পরই কুলসুমের মৃত্যু হয়।
ফুলবাড়িয়ার বিদ্যানন্দ গ্রামের সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক রমজান আলীর (৩৮) পরিবারও একই ধরনের দাবি করেছে। বুকের ব্যথা নিয়ে প্রথমে ফুলবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে তাঁকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
আগুনের সময় সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় ধাক্কাধাক্কির মধ্যে পড়ে রমজান মারা যান বলে তাঁর স্বজনদের দাবি। তাঁর স্ত্রী খাদিজা আক্তার জানান, তিনিও সিঁড়ির মাঝখানে পড়ে গিয়েছিলেন। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে জানিয়ে সবাইকে নিজ নিজ জায়গায় ফিরে যেতে বলা হয়। ফলে নিচে নামা বা ওপরে ওঠা—কোনোটিই সম্ভব হচ্ছিল না। সেই অবস্থাতেই তাঁর স্বামী মারা যান।
রমজানের ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম বলেন, তাঁর ভাই হৃদরোগে আক্রান্ত ছিলেন। চারতলা থেকে নামার সময় ধাক্কাধাক্কির মধ্যে পড়ে গিয়ে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান বলে পরিবারের দাবি। পরে তাঁকে জরুরি বিভাগে নেওয়া হয় এবং হাসপাতাল থেকে ডেথ সার্টিফিকেট ও মরদেহ নেওয়ার গেট পাস দেওয়া হয়।
সাইফুলের অভিযোগ, হাসপাতালের কয়েকটি সিঁড়ি বন্ধ ছিল এবং লিফটও কার্যকর ছিল না। সবগুলো সিঁড়ি খোলা থাকলে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হতো না বলেও দাবি করেন তিনি।
গতকাল বিকেল ৫টা ৫৫ মিনিটের দিকে হাসপাতালের ১১ নম্বর লিফটে আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুনে লিফটের বাইরের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। আগুনের পর হাসপাতালের বিভিন্ন তলা থেকে রোগী ও স্বজনেরা আতঙ্কে দ্রুত নিচে নামতে থাকেন। এতে বেশ কয়েকজন আহত হন।
এ ঘটনায় চারজনের মৃত্যুর তথ্য নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন পদদলিত হয়ে মৃত্যুর বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের একটি রেজিস্টারের পাতার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে আগুনের ঘটনার পর চারজনকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনার তথ্য রয়েছে। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান রেজিস্টারটি হাসপাতালের বলে নিশ্চিত করেছেন।
রেজিস্টার অনুযায়ী, আগুনের ঘটনার পর চারজনকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে দুজন ফুলবাড়িয়া এবং একজন তারাকান্দার বাসিন্দা। পূর্বধলার হাজেরা বেগম নামের আরেক নারীর মৃত্যুর বিষয়টি তখনও যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, রেজিস্টারে নাম থাকা ব্যক্তিরা পদদলিত হয়ে মারা গেছেন—এমন কোনো তথ্য নেই। সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, একজন নার্স তাৎক্ষণিকভাবে মৃত ব্যক্তিদের তালিকাভুক্ত করেছিলেন। তাঁদের শরীরে পদদলিত হওয়ার মতো কোনো চিহ্নও পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তিনি।
ফলে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগুনের পর প্রকৃতপক্ষে কতজনের মৃত্যু হয়েছে এবং তাঁদের মৃত্যুর কারণ কী—তা নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও নিহতদের পরিবারের বক্তব্যে স্পষ্ট মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।