ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টারে দেখা মিলেছে দেশি উদ্ভিদবৈচিত্র্যের দুটি ব্যতিক্রমী ফল—তৈকর ও বনকাঁকরোল। নাম পরিচিত হলেও অনেকের কাছেই এই দুই ফলের চেহারা ও বৈশিষ্ট্য অজানা। স্থানীয়ভাবে তৈকরকে তিকুল বা তিকুর নামেও ডাকা হয়। অন্যদিকে বনকাঁকরোল দেখতে অনেকটা প্রচলিত কাঁকরোলের মতো হলেও আকারে প্রায় দুই থেকে তিন গুণ বড়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টারে সম্প্রতি ফলবৈচিত্র্য সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের সময় এই দুই ফলের সন্ধান পাওয়া যায়। সেখানকার কর্মীরা গাছ দুটির অবস্থানও দেখান। তবে গাছে ফলগুলো বেশ উঁচুতে থাকায় সেগুলোর ছবি তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত গাছের নিচে পড়ে থাকা ফলের ছবিই সংগ্রহ করতে হয়।
তৈকর ফলের বৈশিষ্ট্য
তৈকর মাঝারি আকৃতির পাতাঝরা গাছ। গাছটি প্রায় ১৮ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এর কাণ্ডে খাঁজ থাকে এবং বাকলের রং গাঢ় ধূসর থেকে গাঢ় বাদামি। পাতা সরল, পুরু ও দীর্ঘায়ত ধরনের।
পরিপক্ব তৈকর ফল সাধারণত হলুদ রঙের হয়। ফল বেশ রসালো এবং একেকটির ওজন প্রায় ৭০০ থেকে ৭৫০ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। এতে সাধারণত ৮ থেকে ১০টি রসালো বীজ থাকে। স্বাদে টক-মিষ্টি হওয়ায় ফলটি বিভিন্নভাবে খাবারে ব্যবহার করা হয়।
তৈকর গাছে বছরে দুই দফায় ফলন পাওয়া যায়। প্রথম দফায় আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ফুল আসে এবং নভেম্বর-ডিসেম্বরে ফল সংগ্রহের উপযোগী হয়। দ্বিতীয় দফায় ফেব্রুয়ারির দিকে ফুল আসে, আর এপ্রিল-মে মাসে ফল সংগ্রহ করা যায়। একটি পরিণত গাছে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০টি ফল ধরতে পারে। হেক্টরপ্রতি ফলনের পরিমাণ ৭০ থেকে ৭৫ টন পর্যন্ত হতে পারে।
বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে তৈকর চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। সেখানে স্থানীয়ভাবে ফলটির বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে। কচি তৈকর বিভিন্ন তরকারিতে ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি আচার, জ্যাম ও জেলি তৈরিতেও এটি ব্যবহৃত হয়। কাঁচা ফল কেটে রোদে শুকিয়ে দীর্ঘদিন সংরক্ষণও করা যায়।
বনকাঁকরোলের আকার নজরকাড়া
বনকাঁকরোলের বৈজ্ঞানিক নাম Momordica cochinchinensis। দেখতে সাধারণ কাঁকরোলের মতো হলেও আকারে অনেক বড়। প্রতিটি ফলের ওজন প্রায় আধা কেজি হতে পারে, কখনো এর চেয়েও বেশি হয়। একসময় গ্রামাঞ্চলের ঝোপঝাড় ও বনবাদাড়ে এটি স্বাভাবিকভাবেই জন্মাত। তবে বর্তমানে প্রাকৃতিক আবাসস্থলে এ উদ্ভিদটি তুলনামূলকভাবে দুর্লভ।
বনকাঁকরোল একটি লতানো উদ্ভিদ। বড় গাছকে অবলম্বন করে এটি প্রায় ১৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এর আকর্ষী শক্তিশালী। পাতাগুলো হৃৎপিণ্ডাকৃতি বা প্রশস্ত ডিম্বাকার এবং কিনারা ঢেউখেলানো ও দাঁতযুক্ত। ফুলের রং হলুদ থেকে সাদা পর্যন্ত হতে পারে।
এই কাঁকরোল সবজি হিসেবে রান্নার পাশাপাশি ক্যানডি ও জ্যাম তৈরিতেও ব্যবহার করা যায়। ফলের বীজের চারপাশে থাকা লাল ও তৈলাক্ত শাঁসও খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভারতের কিছু অঞ্চলে এটি দিয়ে ‘জোই গ্যাক’ নামে ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরি করা হয়। ভিয়েতনামেও একই ধরনের রান্না বিভিন্ন উৎসব ও বিয়ের অনুষ্ঠানে পরিবেশন করা হয়ে থাকে।
বিলুপ্তির ঝুঁকিতে দেশি জাত
প্রায় হারিয়ে যেতে বসা বড় আকারের এই বনকাঁকরোলের সন্ধান পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। চকরিয়ার ফাঁসিয়াখালী বনাঞ্চল থেকে তাঁরা উদ্ভিদটি শনাক্ত করেন এবং সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এখন পর্যন্ত কাঁকরোলের ২২টি জাত সংরক্ষণ করেছে। এর মধ্যে তিনটি উন্নত জাত উদ্ভাবনের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে বড় আকারের এই বনকাঁকরোল তাদের সংরক্ষিত জাতগুলোর মধ্যে নেই।
দেশি ফল ও সবজির বৈচিত্র্য ধরে রাখতে তৈকর ও বনকাঁকরোলের মতো স্থানীয় জাত সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণা ও জার্মপ্লাজম সংরক্ষণের মাধ্যমে এসব হারিয়ে যেতে বসা উদ্ভিদ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকিয়ে রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।