বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬
১৯ ভাদ্র ১৪৩৩

সদ্যপ্রাপ্ত

>> ঢেউয়ের ভাষা বোঝেন তাঁরা, এবার এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের দুই সার্ফার

>> ‘আই উইল সি ইউ এগেইন’—ডেঙ্গুতে হারানো বন্ধুর জন্য ৮ বছরের জাইমার শেষ চিঠি

>> তৈকর ও বনকাঁকরোল: হারিয়ে যেতে বসা দুই ব্যতিক্রমী ফলের গল্প

>> জন্মের পরই মিলবে ‘এক-আইডি’, এক কার্ডেই পাওয়া যাবে স্বাস্থ্য-শিক্ষাসহ সরকারি সেবা

>> রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন ডলার ছাড়ালেও পুরোপুরি স্বস্তির সুযোগ নেই: এম মাসরুর রিয়াজ

>> হবিগঞ্জে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামের সংঘর্ষ, আহত ৫০

>> কারাগারে বসেই এমবাপ্পেকে অপহরণের ছক, চক্রের হোতা আটক

>> মিনিয়াপোলিসে বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত ২, তিন পুলিশসহ আহত কয়েকজন

>> দুই স্বাস্থ্যকর্মীর হাতে সাড়ে ১০ হাজারের বেশি স্বাভাবিক প্রসব

>> ১৫ দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হবে: সংসদে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী

আপনি পড়ছেন : বিনোদন

‘আই উইল সি ইউ এগেইন’—ডেঙ্গুতে হারানো বন্ধুর জন্য ৮ বছরের জাইমার শেষ চিঠি


Rabeya ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ১১:৪৭



‘আই উইল সি ইউ এগেইন’—ডেঙ্গুতে হারানো বন্ধুর জন্য ৮ বছরের জাইমার শেষ চিঠি


দুই ছোট্ট মেয়ের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা ছবি। একজন হিয়া, অন্যজন জাইমা। দুজনের হাত ধরা। ছবির নিচে শিশুসুলভ অক্ষরে লেখা—‘ডিয়ার হিয়া, আই লাভ ইউ সো মাচ। আই উইল সি ইউ এগেইন।’ পাশে আঁকা ভালোবাসার চিহ্ন।

মাত্র আট বছরের জাইমা ছবিটি এঁকেছিল তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু হিয়ার জন্য। কিন্তু সেই ছবি হিয়ার হাতে পৌঁছানোর সুযোগ হয়নি। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় হিয়া। বন্ধুর মরদেহ যখন হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্সে নেওয়া হচ্ছিল, তখন ছবিসহ ছোট্ট চিরকুটটি কফিনের একটি রশির সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়।

হিয়ার বাবা মো. খোকন মিয়া বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রকৌশল বিভাগে সায়েন্টিফিক অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কর্মরত। একমাত্র মেয়েকে দাফনের পর তিনি বর্তমানে কুমিল্লার গ্রামের বাড়িতে রয়েছেন।

খোকন মিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৫ আগস্ট হিয়ার মা শাহীনা আক্তার ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আগারগাঁওয়ের লায়ন্স আই অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে হিয়ারও ডেঙ্গু শনাক্ত হলে ২৮ আগস্ট তাকে একই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে ২৯ আগস্ট ধানমন্ডির ইবনে সিনা হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়া হয় তাকে।

হিয়ার মা শাহীনা জানান, নিজের চিকিৎসা পুরোপুরি শেষ না করেই মেয়ের পাশে ছুটে গিয়েছিলেন তিনি। মেয়ের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি তাঁকে ভেঙে দেয়। বমি, পানি পান করতে না পারা এবং পরে খিঁচুনির মতো উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর আর তাকে বাঁচানো যায়নি।

মেয়েকে হারানোর কষ্টে শাহীনা বলেন, চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি করেননি তারা। ডেঙ্গু কীভাবে মেয়েকে আক্রান্ত করল, সেটিও জানেন না। শেষ পর্যন্ত মেয়ের আয়ু ছিল না—এ বাস্তবতাই মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।

হিয়াকে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও সে নিজের অবস্থার ভয়াবহতা বুঝতে পারেনি। বাবা জানান, অ্যাম্বুলেন্সে যাওয়ার সময় দরজা খুলে দিতে বলেছিল হিয়া। সে বাড়ি যেতে চেয়েছিল। এমনকি ঘড়িতে তখন কয়টা বাজে, দিন নাকি রাত—সেটিও জানতে চেয়েছিল। এরপর আইসিইউতে নেওয়ার পর মেয়ের সঙ্গে আর তেমন কথা বলার সুযোগ হয়নি।

মেয়েকে হারানোর পর খোকন মিয়ার একটাই চাওয়া—ডেঙ্গুর কারণে যেন আর কোনো পরিবারকে সন্তান হারাতে না হয়। মশা নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর ও অগ্রাধিকারভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

হিয়ার জন্মদিন ছিল ১৩ জুলাই। সেদিন বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ করে কেক কেটেছিল সে। ঘুরতেও খুব পছন্দ করত হিয়া। গত ফেব্রুয়ারিতে পরিবারের সঙ্গে কক্সবাজারে ঘুরে এসেছিল। সামনে পরিবারের পরিকল্পনা ছিল সাজেক ভ্রমণের। কিন্তু মা-মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ায় সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়ন হয়নি।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেও হিয়া মায়ের জন্মদিন সাজেকে উদ্‌যাপনের কথা ভাবত। মায়ের জন্মদিন ছিল ১৮ সেপ্টেম্বর। এমনকি মায়ের জন্য আগেই একটি উপহারের কার্ড তৈরি করে রেখেছিল সে। একই রকম পোশাক পরে মা-মেয়ে সময় কাটাতেন। মায়ের জন্মদিনের জন্যও একই ধরনের পোশাক কিনে রাখা হয়েছিল। এখন সেসবই পরিবারের কাছে স্মৃতি।

অন্যদিকে, হিয়ার মৃত্যুর খবর জানতে পারে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সুহায়লা জাইমা। সেদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল সে। হিয়াকে হাসপাতালে দেখতে যাওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু স্কুলড্রেস পরার সময়ই আসে বন্ধুর মৃত্যুর খবর।

বাবা জসীম উদ্দীনের হাত ধরে স্কুলড্রেস পরা অবস্থাতেই হাসপাতালে ছুটে যায় জাইমা। কাছের কোনো মানুষের মরদেহ দেখার অভিজ্ঞতা সেটিই ছিল তার প্রথম। বন্ধুকে দেখে বারবার জানতে চাইছিল, এখন সে কী করবে।

বাসা থেকে বের হওয়ার সময় সঙ্গে করে প্যাডের কাগজ নিয়েছিল জাইমা। হাসপাতালে বসেই পেনসিল দিয়ে আঁকতে শুরু করে দুটি ছোট্ট মেয়ের ছবি—একজন হিয়া, অন্যজন জাইমা। দুজনের হাত ধরা। ছবির নিচে লিখে দেয়, ‘ডিয়ার হিয়া, আই লাভ ইউ সো মাচ। আই উইল সি ইউ এগেইন।’

ছবি আঁকা শেষ করে সেটি হিয়াকে দিতে চেয়েছিল জাইমা। পরে ছবিসহ চিরকুটটি অ্যাম্বুলেন্সে থাকা কফিনের একটি রশির সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়।

এর আগে বন্ধুর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া পা ধরে কেঁদেছিল জাইমা। হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পরও তার কান্না থামছিল না। মা-বাবা নানা উপায়ে তার মন অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বারবার ফিরে আসছে হিয়ার কথা।

হাসপাতালে বসেই জাইমা বারবার বলছিল, ‘আই মিস ইউ হিয়া। আই লাভ ইউ সো মাচ।’

হিয়ার পরিবার ও জাইমার পরিবারের সদস্যরা জানান, দুই শিশুর বন্ধুত্ব ছিল গভীর। স্কুল ও বাসা আলাদা হয়ে গেলেও তাদের সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়নি। তারা একে অপরের জন্য ছবি আঁকত, দেখা হলে আদর করত।

তবে এবার জাইমার আঁকা ছবিটি আর হিয়ার হাতে পৌঁছানো হলো না। বন্ধুর জন্য আঁকা সেই ছবির নিচে লেখা আট বছরের শিশুটির সরল বাক্যটিই যেন থেকে গেল—‘আই উইল সি ইউ এগেইন।’