সাতক্ষীরার বিভিন্ন গ্রামে এখন পাট কাটার পর আঁশ ছাড়ানো ও শুকানোর ব্যস্ততা চলছে। কোথাও জমে থাকা পানিতে পাট জাগ দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও কৃষকেরা পানিতে নেমে পাটের আঁশ ছাড়াচ্ছেন। গ্রামের সড়কের পাশেও দেখা যাচ্ছে সারি করে পাটের আঁশ শুকানোর দৃশ্য।
পাট কাটার পর সাধারণত ১৫ থেকে ২০ দিন পানিতে জাগ দেওয়ার পর আঁশ ছাড়ানোর উপযোগী হয়। বর্তমানে জেলার বেশির ভাগ কৃষক এই কাজে ব্যস্ত। কোথাও পাটকাঠি আঁটি করে রাখা হয়েছে, আবার কোথাও ভ্যানে করে পাট নিয়ে বাজারের দিকে যাচ্ছেন কৃষকেরা।
সাতক্ষীরা-যশোর সড়কের তুজলপুর এলাকায় কৃষক মোহাম্মদ আবদুল করিম জানান, তিনি প্রায় ১৮ দিন পাট পানিতে জাগ দিয়ে রেখেছিলেন। কয়েক দিন আগে আঁশ ছাড়ানোর কাজ শেষ করেছেন। এখন আঁটি বেঁধে তা শুকাচ্ছেন। ধান কাটার পর ওই জমিতে পাট চাষ করেছিলেন তিনি। এবারের ফলন ও বাজারদর ভালো থাকায় খরচ বাদ দিয়ে লাভ হবে বলে আশা করছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরার সাতটি উপজেলায় ১১ হাজার ৬৭৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। গত বছর আবাদ হয়েছিল ১১ হাজার ৬০৭ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাটের আবাদ বেড়েছে ৬৮ হেক্টর।
চলতি মৌসুমে এসব জমি থেকে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এক বেল পাটে গড়ে প্রায় ১৮২ কেজি আঁশ থাকে।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম জানান, এ বছর জেলায় পাটের আবাদ ও উৎপাদনের পরিস্থিতি সন্তোষজনক। কয়েকটি এলাকায় এখনো পাট কাটা চলছে। কৃষকেরা প্রতি বিঘায় ১২ থেকে ১৫ মণ পর্যন্ত ফলনের কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, পাটের পাতা জমির উর্বরতা বাড়াতে সহায়তা করে। পাশাপাশি পাটের আঁশ ও পাটকাঠি বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যায়। তবে সাতক্ষীরায় পাটভিত্তিক বড় কোনো শিল্প না থাকায় কৃষকদের উৎপাদিত পাট স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি জেলার বাইরের বাজারেও বিক্রি করতে হয়।
সদর উপজেলার মাধবকাঠি এলাকায় এক নারীকে সড়কের ওপর পাটের আঁশ মেলে শুকাতে দেখা যায়। প্রায় ২০ দিন পানিতে জাগ দেওয়ার পর আঁশ ছাড়িয়ে এখন রোদে শুকানোর কাজ করছেন তিনি।
অন্যদিকে একই এলাকার একটি বিলের পানিতে বসে কয়েকজন কৃষক পাটের আঁশ ছাড়াচ্ছিলেন। তাঁদের একজন আসাদুল সরদার জানান, ১১ শতক জমিতে পাট চাষ করতে ৩০০ গ্রাম বীজ কিনে বুনেছিলেন। সেখান থেকে প্রায় দুই মণ পাট পেয়েছেন। পাশাপাশি পাটকাঠিও হয়েছে। প্রতি আঁটি পাটকাঠি ৬০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করা সম্ভব বলে জানান তিনি।
সদর, তালা ও কলারোয়া উপজেলার কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগের বছরের তুলনায় এবার পাটখেতে রোগবালাইয়ের চাপ কম ছিল। সাধারণত পাটে গোড়া পচা, পাতা শুকিয়ে যাওয়া এবং বিছা পোকার মতো সমস্যা দেখা যায়। তবে এবার এসব রোগ ও পোকার আক্রমণ তুলনামূলক কম হওয়ায় ফলন ভালো হয়েছে।
কলারোয়ার ঝাপাঘাট গ্রামের কৃষক কিবরিয়া সরদার জানান, তিনি পাঁচ কাঠা জমিতে পাট চাষ করেছেন। তাঁর জমিতে ৩৪ আঁটি পাটকাঠি হয়েছে। সব মিলিয়ে আড়াই থেকে তিন মণ পাট পাওয়ার আশা করছেন। চাষ ও পাট জাগ দেওয়াসহ অন্যান্য কাজে তাঁর প্রায় পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। পাট ও পাটকাঠি বিক্রি করে এবার লাভ থাকবে বলে মনে করছেন তিনি।
তালা উপজেলার ইসলামকাটি এলাকার কৃষক আকবার আলী জানান, গত বছর পাটে রোগবালাই বেশি হওয়ায় কয়েক দফা কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়েছিল। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। একই সঙ্গে বাজারে পাটের দামও সন্তোষজনক বলে জানান তিনি।
কলারোয়ার হেলাতলা এলাকার কৃষক আবুল হোসেন বলেন, তিনি প্রতিবছর দুই বিঘা জমিতে পাট চাষ করেন। গত বছর প্রায় ২৫ মণ পাট পেয়েছিলেন। এবার ফলন ভালো হওয়ায় প্রায় ৩০ মণ পাট পাওয়ার আশা করছেন।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমানে মান অনুযায়ী প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। এই দামে কৃষকেরা মোটামুটি সন্তুষ্ট। গত বছরও পাটের বাজারদর প্রায় একই রকম ছিল। মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং মৌসুমের শেষদিকে ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত দামে পাট বিক্রি হয়েছিল।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা সালেহ্ মোহাম্মাদ আবদুল্লাহ জানান, পাটকেলঘাটা এলাকায় পাটের বড় বাজার রয়েছে। পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা সরাসরি বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে কৃষকদের কাছ থেকেও পাট কিনছেন। ফলে কৃষকেরা বিভিন্ন মাধ্যমে বাজারদর জেনে নিজেদের পাট বিক্রি করার সুযোগ পাচ্ছেন।
সব মিলিয়ে অনুকূল আবহাওয়া, রোগবালাইয়ের তুলনামূলক কম আক্রমণ এবং সন্তোষজনক বাজারদরের কারণে চলতি মৌসুমে পাট চাষ করে ভালো লাভের প্রত্যাশা করছেন সাতক্ষীরার কৃষকেরা।