জীবনের কিছু অপূর্ণতা কখনো কখনো মানুষকে এমন একটি পথে নিয়ে যায়, যার কথা সে নিজেও কল্পনা করেনি। পঙ্কজ ত্রিপাঠির জীবন যেন তারই উদাহরণ। কৃষক পরিবারের সন্তান হিসেবে একসময় তাঁর স্বপ্ন ছিল বাবার একটি ট্রাক্টর থাকবে। পড়াশোনা শেষে সেই ট্রাক্টর দিয়ে গ্রামের জমিতে কাজ করবেন। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। আর সেই অপূর্ণ স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত তাঁকে নিয়ে যায় অভিনয়ের জগতে।
আজ পঙ্কজ ত্রিপাঠি হিন্দি সিনেমা ও ওটিটির পরিচিত মুখ। ‘গ্যাংস অব ওয়াসেপুর’, ‘মাসান’, ‘নিউটন’, ‘মিমি’, ‘স্ত্রী’ থেকে ‘মির্জাপুর’—বিভিন্ন চরিত্রে নিজের অভিনয় দিয়ে দর্শকের আলাদা জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। ৫ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মদিন। ১৯৭৬ সালের এই দিনে বিহারের গোপালগঞ্জে জন্ম নেওয়া অভিনেতা এবার ৫০ বছরে পা দিয়েছেন।
পঙ্কজের বাবা ছিলেন কৃষক। ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর নিজেরও একটি স্বপ্ন ছিল—পঙ্কজ চিকিৎসক হবেন। সে লক্ষ্যেই ছেলেকে পড়াশোনায় মন দিতে বলেছিলেন তিনি।
পঙ্কজের ইচ্ছা ছিল পড়াশোনা শেষ করে গ্রামে ফিরে কৃষিকাজ করার। কিন্তু পরিবারের পক্ষে ট্রাক্টর কেনা সম্ভব হয়নি। ফলে বাবার পরামর্শে উচ্চশিক্ষার জন্য পাটনায় যান তিনি।
পাটনায় যাওয়ার পরই তাঁর জীবনে নতুন অধ্যায়ের শুরু। পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হন, আর ধীরে ধীরে থিয়েটারের প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। মঞ্চে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা যত বাড়তে থাকে, চিকিৎসক হওয়ার পুরোনো স্বপ্ন ততই দূরে সরে যায়।
পরে এক অনুষ্ঠানে মজা করে তিনি বলেছিলেন, ‘ডক্টর’ হতে এসে শেষ পর্যন্ত ‘অ্যাক্টর’ হয়ে গেছেন।
অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়লেও শুধু থিয়েটার করে তখন জীবন চালানো কঠিন ছিল। তাই হোটেল ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ নেন পঙ্কজ। এরপর পাটনার একটি হোটেলের রান্নাঘরে কাজ শুরু করেন।
চাকরির পাশাপাশি থিয়েটার চালিয়ে যেতেন তিনি। কখনো দিনের বেলা হোটেলে কাজ করে সন্ধ্যায় নাটকের মহড়ায় যেতেন। আবার কখনো রাতের শিফটে কাজ করে দিনের বেলায় থিয়েটারে সময় দিতেন। প্রায় দুই বছর এভাবেই চলেছে তাঁর জীবন।
হোটেলের চাকরিতে তাঁর মন যে অভিনয়ের দিকেই বেশি ছিল, সেটিও একসময় সহকর্মীদের নজরে আসে। কাজের প্রতি মনোযোগ নিয়ে তাঁকে কথা শুনতে হয়েছে। কিন্তু মঞ্চের প্রতি আকর্ষণ তাঁকে থামাতে পারেনি।
অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেওয়ার সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ় হলে পঙ্কজ ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় পড়ার কথা ভাবেন। কিন্তু সেখানে ভর্তি হতে স্নাতক ডিগ্রি প্রয়োজন ছিল। অথচ অভিনয়ের প্রতি মনোযোগ দিতে গিয়ে তাঁর আগের পড়াশোনা অসমাপ্ত ছিল।
তাই আবার শিক্ষাজীবনে ফেরেন তিনি। স্নাতক শেষ করার পর ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামার ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। প্রথমবার সফল হননি। দ্বিতীয়বারও একই ফল। কিন্তু পরপর ব্যর্থতা তাঁকে দমাতে পারেনি। তৃতীয়বারের চেষ্টায় অবশেষে ভারতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ নাট্যশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। ২০০৪ সালে সেখানে পড়াশোনা শেষ করেন তিনি।
এরপর স্ত্রী মৃদুলা ত্রিপাঠিকে সঙ্গে নিয়ে মুম্বাইয়ে পাড়ি জমান পঙ্কজ। সঙ্গে ছিল না বড় কোনো পরিচিতি কিংবা চলচ্চিত্রজগতের প্রভাবশালী কারও সুপারিশ। ছিল শুধু অভিনয়ের প্রশিক্ষণ, থিয়েটারের অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘ সংগ্রামের আত্মবিশ্বাস।
মুম্বাইয়ে তাঁর শুরুর দিনগুলো ছিল কঠিন। এক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের অফিস থেকে আরেকটিতে নিজের ছবি নিয়ে ঘুরেছেন। বহু জায়গায় অডিশন দিয়েছেন। বিজ্ঞাপনের কাজের জন্য শতাধিক শিল্পীর ভিড়েও দাঁড়িয়েছেন।
কখনো অডিশনের পর শুনতে হয়েছে—তিনি চরিত্রটির জন্য উপযুক্ত নন। বারবার প্রত্যাখ্যাত হতে হতে সেই শব্দটি তাঁর কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছিল।
তবু পঙ্কজ থামেননি। ছোট চরিত্র পেলেও সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে অভিনয় করেছেন। টেলিভিশনেও কখনো পুলিশ, কখনো অন্য পার্শ্বচরিত্রে কাজ করেছেন।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর অনুরাগ কাশ্যপের ‘গ্যাংস অব ওয়াসেপুর’ পঙ্কজ ত্রিপাঠির ক্যারিয়ারে বড় মোড় এনে দেয়। সুলতান কুরেশির চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকের নজর কাড়ে।
এরপর একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ সিনেমা ও ওয়েব সিরিজে কাজ করতে থাকেন তিনি। ‘মাসান’, ‘নিউটন’, ‘বরেলি কি বরফি’, ‘ফুকরে’, ‘লুডো’, ‘মিমি’, ‘স্ত্রী’সহ বিভিন্ন সিনেমায় অভিনয়ের পাশাপাশি ‘মির্জাপুর’-এর কালিন ভাইয়া চরিত্র তাঁকে আরও বড় পরিসরের দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়।
অভিনেতার নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘মির্জাপুর’-এর আগে তিনি মূলত অভিনয়শিল্পীদের তালিকায় থাকা একজন ছিলেন; সিরিজটি জনপ্রিয় হওয়ার পর তাঁর পরিচিতি আরও বড় হয়ে ওঠে।
এত সাফল্যের পরও নিজের কাজ নিয়ে সহজে সন্তুষ্ট হন না পঙ্কজ। নিজের অভিনীত সিনেমা বা সিরিজ খুব বেশি দেখেন না। কারণ দেখতে বসলে নিজের ভুলগুলোই তাঁর চোখে পড়ে।
স্ত্রী মৃদুলা ত্রিপাঠিকেও নিজের অভিনয়ের অন্যতম কঠোর সমালোচক মনে করেন তিনি। মৃদুলা তাঁর কাজের ভালো-মন্দ সরাসরি জানিয়ে দেন বলে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন পঙ্কজ।
শুটিংয়ের সময়ও নিজের অভিনয় নিয়ে পরিচালকের ওপর আস্থা রাখেন তিনি। তাঁর মতে, চরিত্রের জন্য একজন অভিনেতাকে যথেষ্ট প্রস্তুতি নিতে হবে; কিন্তু ক্যামেরা চালু হওয়ার পর পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর বিশ্বাস রাখা জরুরি।
কাজের ব্যস্ততায় কখনো কখনো একটি চরিত্র থেকে বের হয়ে নতুন চরিত্রে প্রবেশ করাও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। ‘ম্যায় অটল হুঁ’ সিনেমায় অটল বিহারি বাজপেয়ীর চরিত্রে অভিনয়ের পর সরাসরি ‘স্ত্রী ২’-এর কাজে যোগ দেওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁকে বিষয়টি নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।
একটি চরিত্রের প্রভাব পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন চরিত্রে গেলে অভিনয়ে তার ছাপ থেকে যেতে পারে—এই উপলব্ধি থেকে চরিত্র বদলের মাঝে পর্যাপ্ত বিরতির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন তিনি।
সিনেমা ও ওটিটির ব্যস্ততার কারণে দীর্ঘ সময় থিয়েটার থেকে দূরে ছিলেন পঙ্কজ। পরে ‘লা-ইলাজ’ নাটকের মাধ্যমে প্রায় ১৫ বছর পর মঞ্চে ফেরেন তিনি। নাটকটির সঙ্গে তাঁর স্ত্রী মৃদুলাও যুক্ত। তাঁদের মেয়ে আশি ত্রিপাঠিও অভিনয়ের জগতে পা রেখেছেন।
মেয়েকে নিজের পরিচয়ের সুবিধা না দিয়ে নিজস্ব পথ তৈরি করার সুযোগ দিতে চান পঙ্কজ। অভিনয়, চলচ্চিত্র নির্মাণ কিংবা লেখালেখি—কোন পথে এগোবেন, সেই সিদ্ধান্তও মেয়ের নিজের হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
পঙ্কজ ত্রিপাঠির গল্প তাই শুধু বলিউডে সফল হওয়ার গল্প নয়। গ্রামের কৃষক পরিবারের ছেলে থেকে পাটনার হোটেলকর্মী, সেখান থেকে থিয়েটারের মঞ্চ, ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় ব্যর্থতার পর সাফল্য, মুম্বাইয়ে অসংখ্য প্রত্যাখ্যান—সবকিছু পেরিয়ে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন তিনি।
একসময় যে ট্রাক্টরটি কিনতে না পারায় কষ্ট পেয়েছিলেন, পরবর্তী জীবনে সেটিকেই নিজের ভাগ্যের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে দেখেছেন তিনি। কারণ সেই ট্রাক্টর হয়তো তাঁর হাতে এলে জীবনটা অন্যরকম হতে পারত।
হয়তো তিনি গ্রামেই থেকে যেতেন। হয়তো কৃষিকাজই হয়ে উঠত তাঁর পেশা। আর তখন হিন্দি সিনেমা হয়তো পেত না পঙ্কজ ত্রিপাঠির অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্র।
আজও নিজেকে তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেয়ে অভিনেতা হিসেবেই পরিচিত থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন পঙ্কজ। তাঁর কাছে অভিনয় শুধু পেশা নয়—এটি এমন এক যাত্রা, যার শুরু হয়েছিল অনেকগুলো না-পাওয়া আর প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে।