নতুন করে সার ডিলার নিয়োগকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সার সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থায় অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। নতুন ডিলার নিয়োগ হলে বর্তমানদের অনেকেই দায়িত্ব হারাতে পারেন—এমন আশঙ্কায় কেউ কেউ সার উত্তোলন ও বিতরণে আগ্রহ হারাচ্ছেন বলে একটি সরকারি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু ডিলার ইচ্ছাকৃতভাবে বরাদ্দ পাওয়া সার উত্তোলন ও কৃষকদের মধ্যে বিতরণে বিলম্ব করছেন। পাশাপাশি কৃষকদের মধ্যে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগও রয়েছে। এর ফলে কয়েকটি এলাকায় সার নিয়ে কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়ও বরাদ্দের সার সময়মতো উত্তোলনে গড়িমসি না করার জন্য ডিলারদের নির্দেশ দিয়েছে।
মানিকগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও নড়াইলসহ বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ে নতুন ডিলার হওয়ার জন্য স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একটি অংশ তৎপর হয়েছেন। কেউ কেউ মন্ত্রী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছ থেকে সুপারিশপত্র বা ডিও লেটার সংগ্রহের চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ অবস্থায় বর্তমান ডিলারদের মধ্যে অনেকে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, নতুন ডিলার নিয়োগের সময় রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে যোগ্যতার বদলে পছন্দের ব্যক্তিরা সুযোগ পেতে পারেন।
কৃষকদের অভিযোগ, সার ব্যবস্থাপনায় নানা সমস্যার কারণে চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। ফলে আমন মৌসুমে সময়মতো জমিতে সার প্রয়োগ করতে সমস্যায় পড়ছেন কৃষকেরা।
নতুন ডিলার নিয়োগের জন্য গত ২৭ আগস্ট কৃষি মন্ত্রণালয় নতুন নীতিমালা প্রকাশ করেছে। এতে একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তিকে ডিলার নিয়োগের সুযোগ না রাখার কথা বলা হয়েছে। ডিলারদের কার্যক্রম মূল্যায়নের ভিত্তিতে তাঁদের ডিলারশিপ নবায়ন বা বাতিলের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় প্রতিটি ইউনিয়নে তিনজন এবং প্রতিটি পৌরসভায় তিনজন করে ডিলার নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে।
নতুন নীতিমালা ঘিরে বর্তমান ডিলারদের বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ার পর বিভিন্ন এলাকায় সার সরবরাহ নিয়ে উত্তেজনাও দেখা দিয়েছে। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে এক ডিলারের গুদাম থেকে কৃষকেরা বিপুল পরিমাণ ইউরিয়া সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে কিছু সার ফেরত আসে। নাগেশ্বরীর কচাকাটা বাজারেও সার দিতে দেরি হওয়ায় ডিলারের গুদামে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। সার পাওয়ার দাবিতে ভূরুঙ্গামারী ও লালমনিরহাটে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভও করেছেন কৃষকেরা।
কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের সার পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি প্রতিবেদন দিয়েছে। সেখানে ডিলার পর্যায়ে অনিয়ম, সময়মতো সার বিতরণ না করা, প্রকৃত কৃষকের তথ্য হালনাগাদ না থাকা এবং একই ব্যক্তির একাধিকবার সার নেওয়ার মতো বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
সারসংকট মোকাবিলায় প্রকৃত কৃষক ও তাঁদের জমির পরিমাণের ভিত্তিতে একটি নির্ভুল ডেটাবেজ তৈরির সুপারিশ করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। পাশাপাশি সার বিতরণের সময় স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, পুলিশ ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গুজব ঠেকাতে মাঠপর্যায়ে প্রচার চালানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সার বরাদ্দ বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট ও গাইবান্ধার কিছু এলাকায় চাহিদা অনুযায়ী সার না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও বেশি দামে সার বিক্রি এবং অবৈধভাবে মজুতের অভিযোগও উঠেছে।
তবে সরকারের দাবি, দেশে প্রকৃতপক্ষে সারের ঘাটতি নেই। কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে এবং একটি চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে। গত ২ সেপ্টেম্বর তিনি জানান, দেশে প্রায় ১৩ লাখ মেট্রিক টন সার মজুত ছিল।
কৃষিমন্ত্রী আরও বলেছেন, সব বর্তমান ডিলারকে একসঙ্গে বাদ দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত সরকারের নেই। নতুন ও পুরোনো—দুই ধরনের ডিলার মিলিয়েই ব্যবস্থা করা হবে। তবে কেউ অবৈধভাবে সার মজুত বা সরবরাহে অনিয়ম করলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারের কাছে দেওয়া একটি প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, নতুন ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ বাড়লে যোগ্য ব্যবসায়ীরা বাদ পড়তে পারেন। একই সঙ্গে সার পরিবহন ও বিতরণ ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হলে কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম নেওয়া এবং সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সরকার অবশ্য বলছে, নতুন ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই করা হবে এবং কৃষকদের কাছে নির্ধারিত দামে সঠিক সময়ে সার পৌঁছে দেওয়াই থাকবে মূল লক্ষ্য। সাম্প্রতিক সময়ে অনিয়মকারী ডিলারদের বিরুদ্ধে ডিলারশিপ বাতিলসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন।