ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, দৃশ্যমান জগতের বাইরেও রয়েছে আল্লাহর সৃষ্টি এক পবিত্র ও অদৃশ্য জগৎ। সেই জগতের অন্যতম সৃষ্টি হলেন ফেরেশতা বা ‘মালাইকা’। ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস ইসলামের ঈমানের ছয়টি মৌলিক বিষয়ের একটি।
ফেরেশতাদের সৃষ্টি, তাঁদের বৈশিষ্ট্য এবং সৃষ্টিজগতের বিভিন্ন কাজে তাঁদের দায়িত্ব সম্পর্কে কোরআন ও হাদিসে বিস্তারিত নির্দেশনা পাওয়া যায়।
মানুষকে মাটি থেকে এবং জিন জাতিকে আগুন থেকে সৃষ্টি করা হলেও ফেরেশতাদের সৃষ্টি করা হয়েছে নুর বা আলো থেকে। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ফেরেশতাদের নুর থেকে, জিনদের আগুনের শিখা থেকে এবং আদম (আ.)-কে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৬)
ফেরেশতারা মানুষের মতো দৈহিক চাহিদা ও প্রবৃত্তির অধীন নন। তাঁদের ক্ষুধা-পিপাসা, ঘুম বা বিশ্রামের প্রয়োজন নেই। তাঁদের মূল বৈশিষ্ট্য হলো আল্লাহর নির্দেশের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য।
কোরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহ ফেরেশতাদের যে নির্দেশ দেন, তাঁরা তা অমান্য করেন না এবং তাঁদের যা করতে বলা হয়, তাঁরা সেটিই পালন করেন। (সুরা আত-তাহরীম, আয়াত: ৬)
ফেরেশতাদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তাঁরা সবসময় আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করেন। কোরআনে বলা হয়েছে, তাঁরা দিন-রাত আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করেন এবং এতে কখনো ক্লান্ত হন না। (সুরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ২০)
ফেরেশতাদের রয়েছে বিশেষ আকৃতি ও ক্ষমতা, যা সাধারণ মানুষের দৃষ্টির বাইরে। সুরা ফাতিরের প্রথম আয়াতে তাঁদের দুই, তিন ও চার ডানার কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং আল্লাহ চাইলে তাঁর সৃষ্টিতে আরও বৃদ্ধি করতে পারেন বলে জানানো হয়েছে।
আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন। এরপরও তাঁর হিকমত অনুযায়ী সৃষ্টিজগতের বিভিন্ন কাজে ফেরেশতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ইসলামি বর্ণনায় কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ফেরেশতার দায়িত্ব বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জিবরাইল (আ.) — নবী-রাসুলদের কাছে আল্লাহর ওহি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।
মিকাইল (আ.) — বৃষ্টি ও রিজিকসহ সৃষ্টিজগতের বিভিন্ন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তাঁর দায়িত্বের সম্পর্ক রয়েছে বলে ইসলামী বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসরাফিল (আ.) — কিয়ামতের সময় শিঙায় ফুঁ দেওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা হিসেবে পরিচিত।
মালাকুল মাউত — নির্ধারিত সময় এলে মানুষের প্রাণ গ্রহণের দায়িত্ব পালন করেন। কোরআনে বলা হয়েছে, মানুষের দায়িত্বে নিয়োজিত মৃত্যুর ফেরেশতা তাদের প্রাণ হরণ করবেন এবং পরে সবাইকে আল্লাহর কাছে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। (সুরা আস-সাজদাহ, আয়াত: ১১)
ফেরেশতাদের দায়িত্ব শুধু মহাজাগতিক বিষয়েই সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও তাঁদের সম্পর্ক রয়েছে। মানুষের কাজ ও কথাবার্তা লিপিবদ্ধ করার জন্য ফেরেশতারা নিয়োজিত রয়েছেন।
কোরআনে বলা হয়েছে, মানুষের ডান ও বাম পাশে থাকা গ্রহণকারীরা তার কর্মকাণ্ড লিপিবদ্ধ করেন। মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করুক, তা সংরক্ষণের জন্য একজন পর্যবেক্ষক প্রস্তুত থাকেন। (সুরা ক্বাফ, আয়াত: ১৭-১৮)
ফেরেশতাদের অস্তিত্ব ও তাঁদের দায়িত্বের প্রতি বিশ্বাস একজন মুমিনের নৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। নিজের প্রতিটি কাজ ও কথা লিপিবদ্ধ হচ্ছে—এমন বিশ্বাস মানুষকে অন্যায় ও অসৎ কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকার জন্য আত্মসংযমী হতে সাহায্য করে।
এ কারণে একাকী অবস্থাতেও একজন বিশ্বাসী ব্যক্তি নিজের কাজের ব্যাপারে সতর্ক থাকার চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে ফেরেশতাদের মতো আল্লাহর অনুগত সৃষ্টির কথা স্মরণ করলে মানুষের মধ্যে স্রষ্টার মহত্ত্ব ও ক্ষমতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আরও গভীর হয়।
ফেরেশতারা ইসলামী বিশ্বাসে আল্লাহর এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। তাঁদের আনুগত্য, দায়িত্ব পালন এবং সৃষ্টিজগতের বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত থাকার বর্ণনা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়—এই বিশাল বিশ্বজগতের প্রতিটি সৃষ্টির পেছনে রয়েছে আল্লাহর নির্ধারিত হিকমত ও শৃঙ্খলা।