সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্লিপার কোচ দুর্ঘটনায় বহু প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। মিরসরাই, বিরামপুর, ওসমানীনগর এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে সংঘটিত একাধিক দুর্ঘটনায় যাত্রী নিহত ও আহত হন। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২১ আগস্ট কুমিল্লার দাউদকান্দির ইলিয়টগঞ্জ এলাকায় একটি স্লিপার কোচে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
আদালতে দাখিল করা এক হলফনামায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) স্বীকার করেছে যে দেশে চলমান ৮২৯টিরও বেশি স্লিপার বাসের কোনো টাইপ অ্যাপ্রুভাল বা আইনি অনুমোদন নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিঙ্গেল ডেকার চেসিসের ওপর অতিরিক্ত উচ্চতার বডি নির্মাণ করায় যানবাহনের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর ও ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বিআরটিএ যশোর সার্কেলে কর্মরত সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) এস এম মাহফুজুর রহমান এবং মোটরযান পরিদর্শক ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে নিয়মবহির্ভূতভাবে একাধিক স্লিপার বাসের নিবন্ধন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, যশোর-ব-১১-০২৫০ থেকে যশোর-ব-১১-০২৬১ সিরিজের ১২টি স্লিপার বাস টাইপ অ্যাপ্রুভাল ছাড়াই এবং যথাযথ শারীরিক পরিদর্শন ব্যতীত নিবন্ধিত করা হয়।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, এসব নিবন্ধনের ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের ঘুষ লেনদেন হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা একটি বেসরকারি চেসিস আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষায় নিয়ম লঙ্ঘন করে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ওই সিরিজের একটি বাস (যশোর-ব-১১-০২৫১) ২০২৪ সালের ১৭ মে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে দুর্ঘটনায় পড়ে। এতে বাসের সুপারভাইজার ও হেলপারসহ পাঁচজন নিহত হন। তদন্ত প্রতিবেদনে বাসটির অনুমোদনহীন আসন বিন্যাস এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামোর বিষয়টি উঠে আসে।
পরবর্তীতে একই বাস ২০২৫ সালের ৬ আগস্ট কুমিল্লার মিয়াবাজার এলাকায় এক বৃদ্ধা নারীকে চাপা দিলে তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হন। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় সড়ক পরিবহন আইনে মামলা দায়ের করা হয়।
সূত্র জানায়, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে তারা গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়ন ও বদলি সুবিধা পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, স্লিপার বাস নিবন্ধন জালিয়াতির অভিযোগে তদন্ত শেষে ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি বিআরটিএর দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, শুধুমাত্র কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না; অবৈধ নিবন্ধন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে অননুমোদিত স্লিপার কোচের নিবন্ধন বন্ধ, বিদ্যমান ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং বিআরটিএর অভ্যন্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন জরুরি। অন্যথায় সাধারণ মানুষকেই এর চরম মূল্য দিতে হবে।