বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে সমন্বিত জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থার মাধ্যমে রোগীর স্বাস্থ্যতথ্য, চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ, রেফারেল ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনাকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরি করা হবে। এর সঙ্গে পর্যায়ক্রমে ইলেকট্রনিক হেলথ কার্ড, ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড, ডিজিটাল রেফারেল ব্যবস্থা, ফার্মেসি ও ল্যাবরেটরি পোর্টাল, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি সেবার প্ল্যাটফর্ম যুক্ত করা হবে।
এর ফলে একজন নাগরিক দেশের যেকোনো অনুমোদিত সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিলে তাঁর প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যতথ্য অনুমোদিত চিকিৎসকের কাছে সহজে পৌঁছানো সম্ভব হবে। রোগীকে বারবার একই চিকিৎসার ইতিহাস দিতে হবে না। একই পরীক্ষা পুনরায় করার প্রয়োজনও কমবে এবং এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে রোগী স্থানান্তরের প্রক্রিয়া আরও সহজ হবে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে ইলেকট্রনিক হেলথ কার্ড। জন্মের পর থেকে টিকা, মাতৃ ও শিশুসেবা, রোগনির্ণয়, পরীক্ষার ফলাফল, ব্যবস্থাপত্র, হাসপাতালে ভর্তি ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার তথ্য ধাপে ধাপে এই ডিজিটাল পরিচিতির সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি রোগের প্রাদুর্ভাব শনাক্ত করতেও এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিভিন্ন হাসপাতাল, ল্যাবরেটরি ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোনো এলাকায় নির্দিষ্ট রোগ বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর হার বেড়ে গেলে দ্রুত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। ডেঙ্গু, হাম, নিপাহ, ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ মোকাবিলায়ও এটি কাজে লাগতে পারে।
স্বাস্থ্য খাতে অর্থ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবস্থাপনাতেও ডিজিটাল পদ্ধতি স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে। কোন হাসপাতালে কত ওষুধ ও সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়েছে, কতটুকু ব্যবহার হয়েছে এবং কী পরিমাণ মজুত রয়েছে—এসব তথ্য ডিজিটালি সংরক্ষণ করা হলে অপচয় ও অনিয়ম শনাক্ত করা সহজ হবে।
নতুন ব্যবস্থা চালু হলেও স্বাস্থ্য খাতে বর্তমানে ব্যবহৃত সব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বাতিল করা হবে না। কার্যকর ও নিরাপদ বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন জাতীয় কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল অবকাঠামো সরকারের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে নাগরিকের স্বাস্থ্যতথ্যের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকার, তথ্যের সাংকেতিক সুরক্ষা, তথ্য ব্যবহারের রেকর্ড এবং নিয়মিত নিরাপত্তা যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।
একযোগে সারা দেশে ব্যবস্থা চালু না করে প্রথম ধাপে ছয় জেলায় পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, নরসিংদী, ঝালকাঠি, নোয়াখালী ও খুলনায় প্রাথমিকভাবে ডিজিটাল স্বাস্থ্য অবকাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট সেবা প্ল্যাটফর্ম পরীক্ষা করা হবে।
এই পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রযুক্তির কার্যকারিতা, স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যবহারিক সুবিধা, রোগীর উপকারিতা, রেফারেল ব্যবস্থার সক্ষমতা এবং তথ্যের মান যাচাই করা হবে। পরবর্তীতে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে দেশের অন্যান্য এলাকায় এটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে দেশের নিজস্ব সফটওয়্যার প্রকৌশলী, ডেটা বিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে এই ব্যবস্থা পরিচালনা ও উন্নয়ন করা হবে। লক্ষ্য হলো এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে রোগীর সেবার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে, সম্পদের ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করা যাবে এবং স্বাস্থ্য খাতে জবাবদিহি ও সুশাসন আরও শক্তিশালী হবে।