শুক্রবার, অক্টোবর ৯, ২০২৬
২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

সদ্যপ্রাপ্ত

>> নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএতে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ, মাহবুব-উসমান-হেমায়েতকে ঘিরে প্রশ্ন

>> ঘুষ ছাড়া মেলে না সেবা, নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএতে দালালচক্রের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ

>> সোনাইমুড়ীর সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য ও সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির অভিযোগ

>> মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে: রাষ্ট্রপতি

>> ট্রাকচালক হত্যা মামলায় হাসিনাসহ ৩৪ আসামির অভিযোগ গঠন ফের পেছাল

>> হাতকড়া পেছনে রেখে সিঁড়ি দিয়ে আদালতে ওঠানো নিয়ে পলকের আপত্তি

>> সড়কে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে কাজ করবে নতুন কমিটি: রিজভী

>> নারায়ণগঞ্জে কারাবন্দি যুবকের ঢামেকে মৃত্যু

>> ভারতে শেখ হাসিনার আইনি মর্যাদা কী, সংসদীয় কমিটিতে প্রশ্ন

>> বিদ্যালয় থেকে শিশুকে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ, ‘মেয়েধরা’ সন্দেহে নারীকে মারধর

আপনি পড়ছেন : এক্সক্লুসিভ

নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএতে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ, মাহবুব-উসমান-হেমায়েতকে ঘিরে প্রশ্ন


Sheikh Mojahidur Rahman ৯ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৮:২৭
নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএতে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ, মাহবুব-উসমান-হেমায়েতকে ঘিরে প্রশ্ন

শেখ মুজাহিদুর রহমান

গাড়ির নিবন্ধন, ফিটনেস সনদ কিংবা ড্রাইভিং লাইসেন্স—সব ক্ষেত্রেই নির্ধারিত সরকারি ফি দিয়ে নিয়ম অনুযায়ী সেবা পাওয়ার কথা। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) জেলা কার্যালয়ে এসব সেবা নিতে গিয়ে বাড়তি অর্থ দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সেবাপ্রার্থী। তাঁদের দাবি, সরাসরি আবেদন করলে নানা জটিলতার মুখে পড়তে হয়, অথচ মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে কাজ দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিআরটিএ নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. মাহবুবুর রহমান। ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং মালিকানা পরিবর্তনের মতো বিভিন্ন সেবায় ‘সিগনেচার’ অনুযায়ী এক হাজার টাকা থেকে শুরু করে সেবার ধরনভেদে লাখ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়। কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ঘিরে একটি সমন্বিত চক্র কাজ করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা আর্থিক নথি, লেনদেনের প্রমাণ কিংবা তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। অভিযোগ অস্বীকার করে মাহবুবুর রহমান বলেছেন, নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএ কার্যালয়ে কোনো দালাল নেই এবং এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত নন।

সরকারি সেবা পেতে বাড়তি অর্থের অভিযোগ

বিআরটিএর আওতায় মোটরযানের নিবন্ধন, ফিটনেস সনদ, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন, শিক্ষানবিশ লাইসেন্স, রুট পারমিট এবং ট্যাক্স টোকেনসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়া হয়। এসব সেবার জন্য নির্ধারিত নিয়ম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও সরকারি ফি রয়েছে।

নিবন্ধনের ক্ষেত্রে কাগজপত্র যাচাই, ফি পরিশোধ এবং মোটরযান পরিদর্শনের পর নিয়ম অনুযায়ী অনুমোদন দেওয়া হয়। ফিটনেস সনদের জন্য গাড়ির উপযুক্ততা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। একইভাবে ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রে আবেদন, পরীক্ষা, বায়োমেট্রিক তথ্য গ্রহণ এবং ফি জমার নির্ধারিত ধাপ রয়েছে।

কিন্তু সেবাপ্রার্থীদের একাংশের অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ে এসব প্রক্রিয়ার মধ্যেই অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি করা হয়। সরাসরি আবেদন করলে কাগজপত্রে ত্রুটি দেখানো, ফাইল আটকে রাখা কিংবা বারবার অফিসে আসতে বলার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় বলে তাঁদের দাবি।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, পরে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সেই জটিলতা নিরসনের আশ্বাস দেওয়া হয়। এভাবে একপর্যায়ে বাড়তি অর্থ দিতে চাপ অনুভব করেন সেবাপ্রার্থীরা। তবে এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনা পৃথকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম এসেছে

সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগে সহকারী পরিচালক মো. মাহবুবুর রহমানের পাশাপাশি মোটরযান পরিদর্শক উসমান গনি, মোটরযান পরিদর্শক সাখায়াত হোসেন এবং সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. হেমায়েত হোসাইনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া উচ্চমান সহকারী ও অফিস সহায়ক পর্যায়ের কয়েকজন কর্মচারীর বিরুদ্ধেও মধ্যস্থতাকারীদের সহযোগিতা করার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, সেবার কাগজপত্র যাচাইয়ের সময় সম্ভাব্য ত্রুটি বা জটিলতার বিষয় সামনে আনা হয়। পরে মধ্যস্থতাকারীরা দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার আশ্বাস দিয়ে আবেদনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁদের দাবি, অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট সেবা দ্রুত সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করা হয়।

তবে নাম উল্লেখ করা প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভূমিকা, তাঁদের মধ্যে অর্থ লেনদেনের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না এবং অভিযোগে বর্ণিত চক্রের অস্তিত্ব স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। ফলে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস ও লাইসেন্স নিয়ে অভিযোগ

মোটরযানের নিবন্ধন ও ফিটনেস সনদ পরিবহন খাতের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবা। নিয়ম অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ফি জমা দিয়ে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এসব সেবা পাওয়ার কথা।

কিন্তু অভিযোগকারীদের দাবি, নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ে সরাসরি আবেদন করলে কখনো কখনো অযৌক্তিক বিলম্বের মুখে পড়তে হয়। অন্যদিকে, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে দ্রুত কাজ সম্পন্ন হওয়ার আশ্বাস পাওয়া যায়।

ফিটনেস সনদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সেবাপ্রার্থী। তাঁদের দাবি, নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সেবা পেতে বিলম্ব হয় এবং কিছু ক্ষেত্রে সরকারি ফির বাইরে অর্থ দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন ও অন্যান্য সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও মধ্যস্থতাকারীদের ওপর নির্ভরশীলতার অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব দাবির পক্ষে নির্দিষ্ট আবেদন নম্বর, অর্থ লেনদেনের নথি কিংবা সংশ্লিষ্ট সেবাগ্রহীতাদের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর ব্যাপ্তি ও প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণে আবেদন নিষ্পত্তির রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা জরুরি।

সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন, প্রয়োজন যাচাইয়ের

মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ থাকার অভিযোগও তুলেছেন কয়েকজন অভিযোগকারী। তাঁদের দাবি, ঢাকায় তাঁর দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এ ছাড়া নিজ এলাকা ও পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদ থাকার অভিযোগও করা হয়েছে।

তবে কথিত সম্পদের মালিকানা, বাজারমূল্য, অর্থের উৎস কিংবা বৈধতা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র, আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী এবং অন্যান্য আর্থিক তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

অভিযোগকারীদের দাবি, প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সম্পদের উৎস যাচাই করা হোক। তদন্তে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

২০২৫ সালের মে মাসে দুদকের অভিযান নিয়ে দাবি

অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের মে মাসে নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএ কার্যালয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, অভিযানের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সতর্ক হয়ে যাওয়ায় প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।

তবে ওই অভিযানের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য, অভিযানে কী তথ্য পাওয়া গিয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে কোনো অনুসন্ধান বা মামলা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে নিশ্চিত নথি পাওয়া যায়নি। তাই আগের অভিযানের সঙ্গে বর্তমানে ওঠা অভিযোগগুলোর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

এ ছাড়া বিআরটিএর সদর দপ্তর থেকে অনিয়ম ও দালালদের তৎপরতা বন্ধে আগে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, এরপরও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযোগ অস্বীকার সহকারী পরিচালকের

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএ নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান প্রথমে কথা বলতে রাজি হননি। পরে তিনি দাবি করেন, তাঁর কার্যালয়ে কোনো দালাল নেই এবং অভিযোগে উল্লেখ করা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তিনি জড়িত নন।

তাঁর বক্তব্যের বিপরীতে কয়েকজন সেবাপ্রার্থী ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বাড়তি অর্থ আদায় এবং মধ্যস্থতাকারীদের তৎপরতার অভিযোগ করেছেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের প্রত্যেকের বক্তব্য গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করা প্রয়োজন।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি

নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএ কার্যালয়কে ঘিরে ওঠা অভিযোগ সরকারি সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অভিযোগকারীরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

একই সঙ্গে প্রতিটি সেবার নির্ধারিত ফি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, আবেদন নিষ্পত্তির সময়সীমা এবং অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি কার্যালয়ে স্পষ্টভাবে প্রদর্শনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। আবেদন গ্রহণ থেকে শুরু করে অনুমোদন ও সনদ প্রদান পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ ডিজিটাল ব্যবস্থায় অনুসরণযোগ্য করা গেলে অযৌক্তিক বিলম্ব ও অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের সুযোগ কমতে পারে।