বর্তমানে কত পরিমাণ গ্যাস বাংলাদেশ পেতে পারে, কোন গ্যাসক্ষেত্র থেকে সরবরাহ আসবে, পাইপলাইনের রুট কী হবে, নির্মাণ ব্যয় কত হবে কিংবা নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের কোনো চূড়ান্ত উত্তর এখনো নেই।
মিয়ানমারের গ্যাসের প্রমাণিত মজুত উল্লেখযোগ্য হলেও দেশটির উৎপাদন আগের তুলনায় কমে গেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় জ্বালানি খাতও চাপে রয়েছে। পাশাপাশি দেশটির উৎপাদিত গ্যাসের বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় চীন ও থাইল্যান্ডে রপ্তানি করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস আনতে হলে শুধু প্রযুক্তিগত নয়, বড় ধরনের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হবে। সীমান্তসংলগ্ন রাখাইন অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি এবং সেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব প্রকল্পটির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। স্থলপথে পাইপলাইন নির্মাণ নিরাপদ হবে কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন।
বিকল্প হিসেবে এলএনজি আমদানির বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। তবে সে ক্ষেত্রে গ্যাস তরলীকরণ, জাহাজে পরিবহন এবং বাংলাদেশে পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরের অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হবে। এছাড়া মিয়ানমারের পর্যাপ্ত এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতা রয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে গ্যাস পাইপলাইনের ধারণা অবশ্য নতুন নয়। প্রায় তিন দশক আগে প্রথম এ ধরনের উদ্যোগের আলোচনা শুরু হয়েছিল। পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি। এবার বাংলাদেশ নিজস্ব প্রয়োজনেই নতুন করে বিষয়টি বিবেচনা করছে।
অন্যদিকে দেশে নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ এলএনজি আমদানি করলেও এখনও ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ সম্ভব হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে এলএনজি টার্মিনালের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায় সংকট আরও বেড়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, মিয়ানমার ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাব্য গ্যাসের উৎস হতে পারে। তবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে গ্যাসের প্রাপ্যতা, মূল্য, পরিবহনব্যবস্থা, নিরাপত্তা, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং প্রকল্পের অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতি নিয়ে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা জরুরি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আনার পরিকল্পনা তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশের গ্যাস সংকটের সমাধান নয়। তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা অনুকূলে থাকলে এটি ভবিষ্যতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।