সম্প্রতি ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. নুরুল ইসলাম উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের এক নীতি সংলাপে তিনি বলেন, শুধু বাজেট বাড়ালেই মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পাঠদানের উপযুক্ত মানসিকতা ও দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষক, গবেষণার সক্ষমতা এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টির পরিবেশ—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে সাত কলেজে কর্মরত বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পাঠদান, গবেষণা ও জ্ঞান সৃষ্টির সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলায় তাঁর বক্তব্য নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। পরে ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, উপাচার্যের বক্তব্যের একটি খণ্ডিত অংশ প্রচার করা হয়েছে। কারও অনুভূতিতে আঘাত লেগে থাকলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকদের ক্ষুব্ধ হওয়ার কারণও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় গবেষণা অবকাঠামো, পর্যাপ্ত সময়, প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনার ঘাটতি থাকার পর তাঁদের গবেষণার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অনেকের কাছে অন্যায্য মনে হতে পারে।
তবে ব্যক্তিবিশেষের যোগ্যতা কিংবা বক্তব্যের ভাষা নিয়ে বিতর্কের আড়ালে আরও বড় একটি প্রশ্ন রয়েছে—বাংলাদেশে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ বলতে আমরা আসলে কী বুঝি?
বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল দায়িত্ব শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান বা পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে সনদ দেওয়া নয়। নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা, সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ এবং সমাজের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে অবদান রাখাও বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মান উন্নয়নের আলোচনায় শুধু বাজেট বা অবকাঠামো নয়, শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণার পরিবেশ, একাডেমিক স্বাধীনতা, প্রশিক্ষণ এবং জ্ঞান সৃষ্টির সুযোগ—সবকিছুকেই গুরুত্ব দিতে হবে।
শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত না করে তাঁদের কাছ থেকে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রত্যাশা করা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা ও গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাকেও পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
শেষ পর্যন্ত বিতর্কটি কোনো একটি ক্যাডার বা কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে সীমাবদ্ধ না রেখে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার কাঠামো ও উদ্দেশ্য নিয়ে হওয়াই বেশি জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়কে সত্যিকার অর্থে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তুলতে হলে পাঠদান, গবেষণা ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টির সংস্কৃতিকে একই সঙ্গে শক্তিশালী করতে হবে।