ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর তিন দশক পেরিয়ে গেল। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু আত্মহত্যা, নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর আজও মেলেনি। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, একাধিক তদন্ত ও আদালতের নির্দেশের পর ২০২৫ সালে ঘটনাটি হত্যা মামলা হিসেবে নতুন করে তদন্তে আসে।
সালমান শাহর পারিবারিক নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জে তাঁর জন্ম। মাত্র কয়েক বছরের চলচ্চিত্রজীবনেই তিনি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের বাসায় অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় সালমান শাহকে। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই দাবি করা হয়, এটি আত্মহত্যা নয়, তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।
প্রথমে ঘটনাটি নিয়ে অপমৃত্যুর মামলা করা হয়। পরে সালমান শাহর বাবা মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে নেওয়ার আবেদন করেন। ১৯৯৭ সালে সিআইডি তদন্ত শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করে।
পরবর্তী সময়ে বিষয়টি বিচার বিভাগীয় তদন্তে যায়। ২০১৪ সালের তদন্ত প্রতিবেদনেও মৃত্যুকে অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পরিবার সেই প্রতিবেদন মেনে নেয়নি।
২০১৬ সালে আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন—পিবিআইকে দায়িত্ব দেয়। প্রায় চার বছর পর, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে পিবিআই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়নি; তিনি আত্মহত্যা করেছেন। তাঁর আত্মহত্যার পেছনে কয়েকটি কারণ থাকার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে সালমান শাহর পরিবার এই প্রতিবেদনেও আপত্তি জানায় এবং আদালতে পুনর্বিবেচনার আবেদন করে।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে আদালত পরিবারের আবেদন গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনাকে হত্যা মামলা হিসেবে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর ২১ অক্টোবর তাঁর মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন।
মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামীরা হক, অভিনেতা আশরাফুল হক ডন, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়।
বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ—সিআইডি।
২০২৬ সালের ৯ আগস্ট ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁকে আদালতে হাজির করে কারাগারে পাঠানো হয়।
তদন্তের স্বার্থে সিআইডি ডনের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে। শুনানি শেষে ২৭ আগস্ট আদালত তাঁকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দেন।
মামলার তদন্তকারীদের দাবি, ডনকে জিজ্ঞাসাবাদ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে ডনের আইনজীবীরা তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং আগের তদন্তগুলোতে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হয়েছে—এ বিষয়টি আদালতে তুলে ধরেছেন।
নতুন হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমাও একাধিকবার পিছিয়েছে। সর্বশেষ ৩০ আগস্ট আদালত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য ২৯ সেপ্টেম্বর নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন।
অর্থাৎ, তিন দশক পরও সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্যের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। এখন সিআইডির তদন্ত এবং আদালতে দাখিল হতে যাওয়া প্রতিবেদনের দিকে নজর রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।
সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী শুরু থেকেই দাবি করে আসছেন, তাঁর ছেলে আত্মহত্যা করেননি; তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। দীর্ঘ তিন দশক ধরে তিনি ছেলের মৃত্যুর বিচার দাবি করে আসছেন।
নতুন করে হত্যা মামলা হওয়ার পরও তদন্তের গতি নিয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁর প্রত্যাশা, তদন্ত দ্রুত শেষ করে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনা হবে এবং দায়ীদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা হবে।
সালমান শাহর মৃত্যুর ৩০ বছর পূর্ণ হলেও তাই প্রশ্নটি এখনো একই—সেদিন ইস্কাটনের সেই ফ্ল্যাটে আসলে কী ঘটেছিল? এর উত্তর মিলতে এখন সিআইডির তদন্ত ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার দিকেই তাকিয়ে আছে তাঁর পরিবার ও ভক্তরা।