শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬
১০ আশ্বিন ১৪৩৩

সদ্যপ্রাপ্ত

>> দ্বিতীয় স্ত্রীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় এমপি গাজী নজরুল আবারও রিমান্ডে

>> রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ফেসবুকে কটূক্তির অভিযোগ, শিক্ষকসহ দুজন অব্যাহতি

>> বাসে ৫ থেকে ১০ টাকা বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ

>> বারিধারায় গাড়িচাপায় নির্মাণশ্রমিক নিহত, কিশোরকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর আদেশ

>> সাভারে বাসে অগ্নিসংযোগ: বাসমালিক, সাংবাদিকসহ ৪০ জনের নামে মামলা

>> সাভারে বাসে অগ্নিসংযোগ: বাসমালিক, সাংবাদিকসহ ৪০ জনের নামে মামলা

>> ভারত থেকে ইলিশ আমদানি বন্ধ, ১০৩ প্রতিষ্ঠানের অনাপত্তিপত্র বাতিল

>> ফুটবলে অরুচি না ধরলেও অন্য খেলায় মন মজেছে কেইনের

>> যেখানেই এনসিপিকে পাওয়া যাবে, সেখানেই লাঠিপেটা দেওয়া হবে: সিলেটে বিএনপি নেতা

>> তেলের দাম আবার ১০০ ডলারের ওপরে, কোন দিকে যাচ্ছে বাজার

আপনি পড়ছেন : বিনোদন

গ্যারেজে বিলাসবহুল গাড়ির সংগ্রহ, বাস্তবে কেমন চালক ছিলেন মহানায়ক উত্তমকুমার


Rabeya ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকাল ৫:৩৫



গ্যারেজে বিলাসবহুল গাড়ির সংগ্রহ, বাস্তবে কেমন চালক ছিলেন মহানায়ক উত্তমকুমার


পর্দায় কখনো মোটরসাইকেলের পেছনে সুচিত্রা সেনকে নিয়ে ছুটছেন উত্তমকুমার, কখনো আবার গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসে পথ পাড়ি দিচ্ছেন। সিনেমার এসব দৃশ্য দেখে মনে হতে পারে, গাড়ি কিংবা মোটরসাইকেল চালানো তাঁর কাছে ছিল খুবই স্বাভাবিক বিষয়। তবে বাস্তব জীবনের গল্প ছিল কিছুটা ভিন্ন।

৩ সেপ্টেম্বর জন্মশতবর্ষে পা দিয়েছেন বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা উত্তমকুমার। ১৯২৬ সালের এই দিনে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। অভিনয়ের মাধ্যমে পরবর্তী সময়ে তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালির প্রিয় ‘মহানায়ক’। জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে তাঁকে ঘিরে নানা আয়োজনের পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিজীবনের নানা অজানা গল্পও নতুন করে আলোচনায় আসছে।

উত্তমকুমারের ব্যক্তিগত জীবনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল গাড়ির প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ। নতুন গাড়ির মডেল সম্পর্কে খোঁজ রাখা, গাড়ির যত্ন নেওয়া কিংবা সুযোগ পেলেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়া—এসব ছিল তাঁর পছন্দের বিষয়। তবে এত গাড়ির মালিক হয়েও নিজে গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে খুব একটা স্বচ্ছন্দ ছিলেন না তিনি। অধিকাংশ সময় তাঁর বিশ্বস্ত চালকেরাই গাড়ির স্টিয়ারিং সামলাতেন।

গ্যারেজে ছিল একাধিক দামি গাড়ি

তারকাখ্যাতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তমকুমারের গাড়ির সংগ্রহও বড় হতে থাকে। বিভিন্ন সময়ে তাঁর গ্যারেজে ছিল মরিস, ডজ কিংসওয়ে, র‍্য্যাম্বলার, শেভ্রোলে ইম্পালা ও অ্যাম্বাসেডরের মতো গাড়ি।

এর মধ্যে ডজ কিংসওয়ের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল বলে পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠদের স্মৃতিচারণায় জানা যায়। বড় আকৃতির এই মার্কিন গাড়িটি সে সময় বিলাসিতা ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিল।

পরিবার, বন্ধু কিংবা ঘনিষ্ঠজনদের নিয়ে গাড়িতে ঘুরতে পছন্দ করতেন উত্তমকুমার। শুটিংয়ের ব্যস্ততার মধ্যেও সময় পেলেই লং ড্রাইভে বেরিয়ে যেতেন। ষাটের দশকে শেভ্রোলে ইম্পালা নিয়ে ডায়মন্ড হারবারসহ কলকাতার আশপাশে ঘুরে বেড়ানোর কথাও তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের স্মৃতিতে রয়েছে।

পরবর্তী সময়ে তাঁর সংগ্রহে যুক্ত হয় অ্যাম্বাসেডর। জীবনের শেষ দিকে দুটি সাদা অ্যাম্বাসেডর ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন তাঁর পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠরা। এর একটি গাড়ির নম্বর ছিল ‘৮৭৮৭’। মৃত্যুর পরও গাড়িটি গিরিশ মুখার্জি রোডের বাড়ির গ্যারেজে ছিল। তাঁর মরদেহও ওই গাড়িতে করে বাড়িতে আনা হয়েছিল বলে স্মৃতিচারণায় উল্লেখ পাওয়া যায়।

উত্তমের গাড়ির তালিকায় ছিল মরিস মাইনরও

গাড়ির প্রতি উত্তমকুমারের ভালোবাসার আরেকটি স্মারক ছিল মরিস মাইনর। নতুন গাড়ি কেনার পর নিজের ব্যবহৃত এই গাড়িটি তিনি চলচ্চিত্র প্রযোজক কেদারনাথ সেনের কাছে বিক্রি করেছিলেন। পরে গাড়িটির মালিক হন কেদারনাথের ছেলে সুবোধ সেন।

মজার বিষয় হলো, উত্তমকুমারের অভিনীত ‘রাজকুমারী’ ছবিতেও ওই মরিস মাইনরকে দেখা যায়। কিশোর কুমার ও আশা ভোসলে গাওয়া ‘বন্ধ ঘরের অন্ধকারে থাকব না’ গানের দৃশ্যের বড় অংশে গাড়িটির উপস্থিতি ছিল।

শুধু গাড়ি কেনাতেই উত্তমকুমারের আগ্রহ সীমাবদ্ধ ছিল না। নতুন মডেল, যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও তাঁর কৌতূহল ছিল। দীর্ঘদিনের সহকারী সাধন বাগচীর স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, গাড়ির যত্নের ব্যাপারে মহানায়ক ছিলেন বেশ খুঁতখুঁতে। গাড়ি থেকে অস্বাভাবিক কোনো শব্দ শুনলেই সেটি পরীক্ষা করানোর ব্যবস্থা করতেন।

কলকাতার এন্টালি-সিআইটি রোড এলাকার গাড়ি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও নতুন মডেলের খবর নিতেন তিনি। সুযোগ পেলেই নিজের গাড়ির গ্যারেজে গিয়ে সেটি দেখতেন। কাজের প্রয়োজনে কলকাতার বাইরেও গাড়িতে যাতায়াত করতেন।

স্টিয়ারিংয়ে কি স্বচ্ছন্দ ছিলেন মহানায়ক?

এখানেই রয়েছে গল্পের ভিন্ন দিক। সিনেমায় গাড়ি চালানোর দৃশ্যে উত্তমকুমারের শরীরী ভাষা ছিল একেবারেই স্বাভাবিক। কিন্তু তাঁর ছোট ভাই অভিনেতা তরুণ কুমারের স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, বাস্তব জীবনে গাড়ি চালানোর সময় উত্তম খুব একটা স্বচ্ছন্দ ছিলেন না।

এ কারণে সাধারণত গাড়ি চালানোর দায়িত্ব বিশ্বস্ত চালকদের ওপরই ছেড়ে দিতেন তিনি। ন্যাপা ও প্রভু নামের দুই চালকের কথা বিভিন্ন স্মৃতিচারণায় পাওয়া যায়। শুটিংয়ের ব্যস্ততা কিংবা দূরের যাত্রায় তাঁরা দীর্ঘদিন উত্তমকুমারের সঙ্গী ছিলেন।

তবে এর অর্থ এই নয় যে উত্তম কখনোই গাড়ির স্টিয়ারিং ধরতেন না। কখনো কখনো চালককে পাশে বসিয়ে নিজেই গাড়ি চালাতেন। বিশেষ করে শুটিং শেষে ফেরার পথে এমনটা করার কথা ঘনিষ্ঠদের স্মৃতিতে রয়েছে।

‘সপ্তপদী’র সেই বিখ্যাত মোটরসাইকেল

উত্তমকুমারের বাহন প্রসঙ্গে ‘সপ্তপদী’র কথা আলাদা করে বলতেই হয়। ১৯৬১ সালে মুক্তি পাওয়া অজয় কর পরিচালিত এই ছবির ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ গানের দৃশ্যে মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন উত্তমকুমার, আর পেছনে সুচিত্রা সেন। বাংলা সিনেমার অন্যতম স্মরণীয় রোমান্টিক দৃশ্য হয়ে আছে এটি।

মোটরসাইকেলের তুলনায় অবশ্য চার চাকার গাড়ির প্রতিই উত্তমকুমারের আগ্রহ বেশি ছিল। ‘সপ্তপদী’র মোটরসাইকেল দৃশ্যের জন্য তিনি প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন বলেও বিভিন্ন স্মৃতিচারণায় উল্লেখ রয়েছে।

ক্যামেরার সামনে সেই প্রশিক্ষণের ফলও স্পষ্ট ছিল। মোটরসাইকেল চালানোর সময় তাঁর অঙ্গভঙ্গি ও অভিব্যক্তিতে কোনো অস্বস্তি ধরা পড়েনি। অভিনয়ের দক্ষতায় দৃশ্যটিকে করে তুলেছিলেন বাস্তবসম্মত।

‘দেয়া নেয়া’য় চালকের ভূমিকায় উত্তম

গাড়ির সঙ্গে উত্তমকুমারের পর্দার সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয় ১৯৬৩ সালের ‘দেয়া নেয়া’ ছবিতে। সেখানে তাঁর চরিত্র প্রশান্ত রায়। গল্পের প্রয়োজনে নিজের পরিচয় গোপন করে ‘হৃদয়হরণ’ নামে গাড়িচালকের কাজ নেন তিনি।

ফলে ছবিটির গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়েই রয়েছে গাড়ি। মালিক ও চালকের সম্পর্ক, পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং চরিত্রগুলোর নানা ঘটনা—সবকিছুর সঙ্গে গাড়িটি কোনো না কোনোভাবে যুক্ত।

এ ছবিকে ঘিরে একটি প্রচলিত গল্পও রয়েছে। বলা হয়, গাড়ি চালানোর দৃশ্য এতটাই উপভোগ করতেন উত্তমকুমার যে কখনো কখনো পরিচালক ‘কাট’ বলার পরও কিছুক্ষণ গাড়ি চালিয়ে যেতেন। তবে এই গল্পের নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক উৎস স্পষ্ট নয়। তাই এটিকে মহানায়ককে ঘিরে প্রচলিত একটি গল্প হিসেবেই দেখা হয়।

বাস্তবে অনভ্যস্ত, পর্দায় নিখুঁত

বাস্তব জীবনে গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে খুব স্বচ্ছন্দ না হলেও ক্যামেরার সামনে চালকের চরিত্রে উত্তমকুমার ছিলেন বিশ্বাসযোগ্য। ‘দেয়া নেয়া’ তার অন্যতম উদাহরণ। আবার ‘শুধু একটি বছর’ ছবিতেও গাড়ি রেসিংয়ের দৃশ্যে তাঁকে দেখা গেছে।

স্টিয়ারিং ধরার ধরন, সামনে তাকানোর ভঙ্গি কিংবা চালকের ছোট ছোট অভিব্যক্তি—সবকিছুতেই তিনি এমন স্বাভাবিক অভিনয় করতেন যে দর্শকের পক্ষে তাঁকে অনভিজ্ঞ চালক হিসেবে কল্পনা করা কঠিন।

এখানেই অভিনেতা উত্তমকুমারের সাফল্য। বাস্তবে গাড়ি চালানোর চেয়ে গাড়ি সংগ্রহ, যত্ন নেওয়া ও গাড়িতে ঘুরে বেড়াতেই যিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন, ক্যামেরার সামনে তিনিই অনায়াসে হয়ে উঠতেন দক্ষ চালক।

জন্মশতবর্ষে মহানায়ককে ঘিরে যখন নতুন করে আলোচনা চলছে, তখন তাঁর অভিনয়জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনের নানা অধ্যায়ও সামনে আসছে। পোশাক, চেহারা, খাবার, বন্ধুত্ব কিংবা শখ—এসবের মতোই গাড়ির প্রতি উত্তমকুমারের ভালোবাসার গল্পও তাঁর বর্ণময় জীবনের একটি আকর্ষণীয় অংশ।