বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬
৮ আশ্বিন ১৪৩৩

সদ্যপ্রাপ্ত

>> স্লুইসগেটের নিচে ভাসছিল প্লাস্টিকের ড্রাম, ভেতরে মিলল অর্ধগলিত মরদেহ

>> মিয়ানমার থেকে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে টেকনাফে নৌকাডুবি, রোহিঙ্গা মা-ছেলের মৃত্যু

>> সড়ক থেকে বাড়ি পর্যন্ত ২০ সিসিটিভি, হ্যাকিং ও মাদক মামলায় ৬ জন কারাগারে

>> জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় দুই অঙ্কের মূল্যস্ফীতির শঙ্কা

>> সাকিবসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে শেয়ারবাজার কারসাজির মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন ১৭ নভেম্বর

>> ‘আমার দুধের বাচ্চাকে কেন ভিকটিম ব্লেমিং করা হচ্ছে’—প্রশ্ন অপ্রতিমের মায়ের

>> চীনের যে কারখানায় প্রতি মাসে তৈরি হয় ৬০ লাখ স্মার্টফোন

>> দুই আইনজীবীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননা মামলার শুনানি হয়নি, নতুন তারিখ ২৬ অক্টোবর

>> শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সের টাকা প্রতিদিন গণনার সিদ্ধান্ত

>> সাগরে মাছ ধরার নৌযান বাড়ছে, কমছে ইলিশের আহরণ

আপনি পড়ছেন : বিনোদন

মাই রিকশা, মাই রুল


Rabeya ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ১১:০৩



মাই রিকশা, মাই রুল


আমার জীবনে ভাগ্য জিনিসটা বড় অদ্ভুত। লটারিতে কখনো পুরস্কার জোটে না, কিন্তু পোলাওয়ের পাতিলে থাকা এলাচি যেন আমার প্লেটের ঠিকানা মুখস্থ করে রেখেছে। পাঁচটা এলাচি দিলে পাঁচটাই কোনো না কোনোভাবে আমার দাঁতের নিচে পড়ে।

বাইক চালানোর ক্ষেত্রেও আমি বেশ সতর্ক। প্রাইভেট কার, বাস কিংবা ট্রাক—কারও সঙ্গে এখনো বড় ধরনের ঝামেলা হয়নি। কোরবানির সময় রাস্তার মাঝখানে গরু দাঁড়িয়ে থেকেও আমাকে বিপদে ফেলতে পারেনি। কিন্তু অটোরিকশার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা বরাবরই অন্যরকম।

কখনো রিকশাওয়ালা হঠাৎ উল্টো দিক থেকে হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে আমার সামনে চলে আসে। আবার কখনো আমি ব্রেক কষলেও পেছন থেকে রিকশা এসে বাইকের সঙ্গে এমনভাবে ধাক্কা দেয়, মনে হয় বহুদিনের পরিচয়ের পর দুজনের দেখা হয়েছে।

শহরে অটোরিকশার সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে মাঝে মাঝে মনে হয় রাস্তা আসলে গাড়ি চলাচলের জন্য নয়—অটোরিকশাগুলো পার্ক করার জন্য বানানো হয়েছিল, আর ভুল করে তার মধ্যে ঢাকা শহরটা তৈরি হয়ে গেছে।

সেদিনও অফিস শেষে স্বাভাবিক গতিতে বাইক চালিয়ে ফিরছিলাম। রাস্তা বেশ ফাঁকা। নিজের লেনেই ছিলাম। হঠাৎ পেছন থেকে—

ঠাস!

ধাক্কায় বাইক সামনে এগিয়ে গেল। আমি সামনের দিকে ঝুঁকে পড়লাম। হেলমেটের ভেতর মনে হলো, আত্মাটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য বাইরে উঁকি দিয়ে আবার ফিরে এসেছে।

বাইক থামিয়ে পেছনে তাকাতেই অটোরিকশাওয়ালা হাত তুলে বলল,

—ভাই, কিছু হয় নাই।

আমি বললাম,

—কীভাবে কিছু হয়নি? আমার নাম্বারপ্লেট তো বাঁকা হয়ে গেছে!

সে খুব স্বাভাবিকভাবে বলল,

—নাম্বারপ্লেট দিয়া কী হইব মামা? আমাগো তো নাম্বারই নাই। গাড়ি চলতাছে না? খাড়ান, বাঁকা অংশটা সোজা কইরা দিই।

তার কথা শুনে রাগ আরও বেড়ে গেল। কিন্তু তার চেয়েও বেশি অবাক হলাম যখন সবশেষে সে তার সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তিটা সামনে আনল—

—মামা, আমরা গরিব মানুষ।

আমি বললাম,

—গরিব মানুষ বলে কি আমার বাইকে পেছন থেকে ধাক্কা দেবেন?

সে পাল্টা প্রশ্ন করল,

—তাইলে কী করব?

—ব্রেক করবেন!

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

—ব্রেক তো মাঝেমধ্যে কামই করে না মামা!

তখন বুঝলাম, এই বিতর্কে যুক্তি খরচ করে লাভ নেই। তাই মোবাইল বের করে ফেসবুক লাইভে চলে গেলাম।

বললাম,

—বন্ধুরা, আপনারা নিজেরাই দেখেন। ভাই সাহেব পেছন থেকে এসে আমার বাইকে ধাক্কা দিয়েছেন। এখন আবার বলছেন তিনি গরিব মানুষ!

ক্যামেরা ঘুরিয়ে রিকশাওয়ালাকে দেখাতেই লোকটি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল। এরপর খুব শান্তভাবে আমাকে জিজ্ঞেস করল,

—ভাই, আপনার ফলোয়ার কয়জন?

আমি বললাম,

—প্রায় ১৬ হাজার।

সে মুচকি হাসল। এরপর লুঙ্গির গিট থেকে মোবাইল বের করে বলল,

—আমার ‘মাই রিকশা মাই রুল’ পেজে ছয় লাখ। আমিও লাইভে যাই?

আমি তখনও বিষয়টা সিরিয়াসলি নিইনি।

কিন্তু দুই মিনিট পর দেখি তার লাইভে প্রায় চার হাজার মানুষ। আর আমার লাইভে দর্শক ৭৮ জন!

আমি বললাম,

—আপনি আমাকে ধাক্কা দিয়েছেন, আবার লাইভে যাচ্ছেন কেন?

সে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নিজের বক্তব্য শুরু করে দিল,

—ভাইসব, আমি গরিব মানুষ। আজকে রাস্তায় এক বাইকওয়ালা আমাকে হেনস্তা করতাছে। বাইকওয়ালাদের জন্য আমাদের অনেক বেশি ব্রেক করতে হয়। এত ব্রেক করলে ব্রেকও তো একসময় কাজ করা বন্ধ কইরা দিতে পারে!

এরপর কমেন্টের বন্যা শুরু হলো।

‘ভাই, ভয় পাবেন না।’

‘আমরা আছি।’

‘বাইকওয়ালাকে ছাড়বেন না।’

একজন আবার লোকেশন জানতে চাইল। লিখল, ‘লোকেশন দেন, আমরা আসতেছি।’

এবার আমার কপালে ঘাম দেখা দিল।

আমার নিজের লাইভে তখন একমাত্র সক্রিয় দর্শক আমার স্ত্রী। তার কমেন্ট—

‘তুমি খালি রিকশাওয়ালাদের সাথেই ঝগড়া করো। কাল থেকে অফিসে বাইক নিয়ে যেও না। হেঁটে যেও!’

রিকশাওয়ালা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,

—মামা, এখন কী করবেন? আমার ফলোয়াররা তো কইতাছে দোষ আপনার!

তখন বুঝলাম, ধাক্কা খাওয়ার পর আমি শুধু বাইকের নাম্বারপ্লেটই বাঁকাইনি, ঘটনাটাও উল্টো দিকে ঘুরে গেছে।

যে মানুষটি আমার বাইকে ধাক্কা দিয়েছে, কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যেন আমিই তাকে হয়রানি করেছি। শেষ পর্যন্ত আর কোনো ঝামেলায় না গিয়ে বাইক স্টার্ট করলাম।

চলে যাওয়ার আগে অবশ্য রিকশাওয়ালাকে রাস্তার নিয়মকানুন নিয়ে ছোটখাটো একটা বক্তৃতা দিয়ে দিলাম।

পেছন থেকে তার শেষ কথাটা ভেসে এল—

—মামা, আমার পেইজটা কিন্তু ফলো কইরেন!

পরদিন সকালে আবার বাইক নিয়ে অফিসের পথে বের হলাম। তবে এবার আমার কৌশল বদলে গেছে।

রাস্তায় অটোরিকশার সঙ্গে কোনো ঝামেলা হলে আগে বাইকের ক্ষতি দেখব না। প্রথমেই জিজ্ঞেস করব—

‘মামা, আপনার ফলোয়ার কত?’