বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬
৮ আশ্বিন ১৪৩৩

সদ্যপ্রাপ্ত

>> চীনের যে কারখানায় প্রতি মাসে তৈরি হয় ৬০ লাখ স্মার্টফোন

>> দুই আইনজীবীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননা মামলার শুনানি হয়নি, নতুন তারিখ ২৬ অক্টোবর

>> শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সের টাকা প্রতিদিন গণনার সিদ্ধান্ত

>> সাগরে মাছ ধরার নৌযান বাড়ছে, কমছে ইলিশের আহরণ

>> মাছের ব্যবসা ছেড়ে ছিনতাইয়ে, ভোর হলেই ছুরি হাতে বের হতেন সাদ্দাম

>> চুয়েটে ফটক বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, চলছে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি

>> ট্রলারের ইঞ্জিন বিকল, সাগরে ভাসছেন ১৮ জেলে

>> হরমুজ প্রণালি খুলতে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ৩ শর্ত

>> জ্বালানি তেল থেকে ১০ বছরে সরকার পেয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা

>> একলাফে জ্বালানি তেলের দাম ২০ টাকা বাড়ানো—বিকল্প কি ছিল?

আপনি পড়ছেন : পটুয়াখালী

সাগরে মাছ ধরার নৌযান বাড়ছে, কমছে ইলিশের আহরণ


Rabeya ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১:৪৯



সাগরে মাছ ধরার নৌযান বাড়ছে, কমছে ইলিশের আহরণ


পটুয়াখালীর কলাপাড়ার মহিপুর মৎস্য বন্দরে ইলিশ মৌসুমে মাছ ধরার ব্যস্ততা বেড়েছে। ছোট-বড় অসংখ্য নৌযান প্রতিদিন সাগরের দিকে যাচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাবে, সাত-আট বছর আগে মহিপুর থেকে প্রায় ৮০০টি নৌযান সাগরে মাছ ধরতে যেত। বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০ হয়েছে।

তবে নৌযানের সংখ্যা বাড়লেও সমুদ্র থেকে মাছ আহরণ একই হারে বাড়েনি। গবেষকদের মতে, অতিরিক্ত মাছ ধরার চাপ ইলিশ কমে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণগুলোর একটি। এর পাশাপাশি নিষিদ্ধ ও সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল, নদীতে চর পড়া, পানিদূষণ, পানিপ্রবাহের পরিবর্তন, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, প্রায় তিন দশক আগে মহিপুর এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হওয়ার পর সেখানে একের পর এক বরফকল গড়ে ওঠে। মাছ সংরক্ষণ ও পরিবহনের সুযোগ তৈরি হওয়ায় ব্যবসা সম্প্রসারিত হয়। এর সঙ্গে বাড়তে থাকে নৌযান ও জেলের সংখ্যা।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০-১১ অর্থবছরে দেশে সামুদ্রিক মাছ ধরার যান্ত্রিক ছোট নৌযান ছিল ২১ হাজার ৭২৬টি। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ হাজার ৮৫৯টিতে। অর্থাৎ প্রায় এক দশকে নৌযান বেড়েছে ৫১ শতাংশ।

অন্যদিকে একই সময়ে সমুদ্র থেকে মাছ আহরণ বেড়েছে ২৩ শতাংশ। ২০১০-১১ অর্থবছরে যেখানে ৫ লাখ ৪৬ হাজার ২৮৩ টন মাছ আহরণ করা হয়েছিল, ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা বেড়ে ৬ লাখ ৭১ হাজার ১০৪ টনে পৌঁছায়।

মৎস্য অধিদপ্তরের একটি পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, সামুদ্রিক মাছ ধরার নৌবহর বছরে গড়ে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ হারে বাড়লেও মাছ আহরণের প্রবৃদ্ধি ছিল গড়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের পর মাছ আহরণের প্রবৃদ্ধিও অনেকটা স্থবির হয়ে পড়ে।

ইলিশের উৎপাদনেও পতন

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের মোট ইলিশ উৎপাদনও কমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেকর্ড ৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৪২ টন ইলিশ আহরণ করা হয়েছিল। পরের বছর তা কমে ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ টনে নেমে আসে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরও কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৮৮ টনে।

অর্থাৎ দুই বছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন কমেছে ৭১ হাজার ৫৪ টন বা প্রায় ১২ দশমিক ৪ শতাংশ।

এই পতনের বড় অংশই এসেছে সমুদ্র থেকে ইলিশ আহরণ কমে যাওয়ায়। ২০২১-২২ অর্থবছরে সমুদ্র থেকে প্রায় ৩ লাখ ২২ হাজার টন ইলিশ পাওয়া গেলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে প্রায় ২ লাখ ৫১ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। তিন বছরে সামুদ্রিক ইলিশের আহরণ কমেছে প্রায় ৭১ হাজার টন বা ২২ শতাংশ।

অন্যদিকে নদী ও অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে ইলিশ আহরণে বড় ধরনের পতন দেখা যায়নি। ২০২১-২২ অর্থবছরে এসব উৎস থেকে ২ লাখ ৪৫ হাজার টন ইলিশ পাওয়া গিয়েছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেই পরিমাণ ছিল প্রায় ২ লাখ ৪৯ হাজার টন।

আধুনিক প্রযুক্তিতেও বাড়ছে মাছ ধরার সক্ষমতা

শুধু নৌযানের সংখ্যা নয়, মাছ শনাক্ত ও ধরার সক্ষমতাও বেড়েছে। অনেক নৌযানে এখন সোনার, ইকো সাউন্ডারসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব যন্ত্রের মাধ্যমে পানির নিচে মাছের অবস্থান, গভীরতা ও ঝাঁকের ঘনত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

ইলিশ গবেষকদের মতে, এসব প্রযুক্তির সঙ্গে অত্যন্ত কার্যকর জালের ব্যবহার মাছের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। মাছের ঝাঁক শনাক্ত করে নির্দিষ্ট এলাকায় জাল ফেলায় একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ মাছ আহরণ সম্ভব হচ্ছে।

তবে গবেষকদের মতে, শুধু প্রযুক্তি নয়—কোথায়, কখন, কী ধরনের জাল ব্যবহার করে এবং কী পরিমাণ মাছ ধরা হচ্ছে, তার কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ।

সামুদ্রিক ইলিশে ছোট নৌযানের আধিপত্য

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে সমুদ্র থেকে মোট ৩ লাখ ১৩ হাজার ৫৯৩ টন ইলিশ আহরণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ছোট ও মাঝারি নৌযান থেকে এসেছে ৩ লাখ ৫ হাজার ৮১২ টন। শিল্প ট্রলার থেকে পাওয়া গেছে ৭ হাজার ৭৮১ টন। অর্থাৎ ওই অর্থবছরে সামুদ্রিক ইলিশের প্রায় ৯৭ দশমিক ৫ শতাংশই আহরণ করেছে ছোট ও মাঝারি নৌযান।

মহিপুর মৎস্য বন্দর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি দিদার উদ্দিন আহমেদ মাসুমের ভাষ্য, বর্তমানে ইলিশ মৌসুমে মহিপুরকে কেন্দ্র করে প্রায় দেড় হাজার ছোট-বড় নৌযান সাগরে মাছ ধরতে যায়। কয়েক বছর আগেও এ সংখ্যা ৮০০-এর বেশি ছিল না।

তবে ইলিশ কমে যাওয়ার কারণ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভিন্ন মত রয়েছে। ছোট নৌযানের মালিকেরা গভীর সমুদ্রে চলাচলকারী বড় ট্রলারকে দায়ী করছেন। অন্যদিকে শিল্প ট্রলারের মালিকেরা নদী ও মোহনায় জাটকা এবং ডিমওয়ালা ইলিশ ধরা বন্ধে নজরদারির ওপর জোর দিচ্ছেন।

বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এনাম চৌধুরীর দাবি, ২০২৩ সালের পর গভীর সমুদ্রে ইলিশের উপস্থিতি অনেক কমে গেছে। তাঁর মতে, নদী ও মোহনায় জাটকা ধরা পড়ায় ইলিশের স্বাভাবিক চলাচলও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সরকারের পক্ষ থেকেও ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে। এর পেছনে অতিরিক্ত আহরণ, যান্ত্রিক নৌযানের সংখ্যা বৃদ্ধি, পরিবেশগত পরিবর্তনসহ কোন কোন কারণ কতটা দায়ী, তা নির্ণয়ে কাজ চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।