দুই দম্পতির একটি নৈশভোজকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে অলিভিয়া ওয়াইল্ড পরিচালিত সিনেমা ‘দ্য ইনভাইট’। শুরুতে সাধারণ আড্ডা ও হাসি-ঠাট্টায় জমে উঠলেও সময়ের সঙ্গে সেই আড্ডাই পরিণত হয় অস্বস্তিকর এবং গভীর ব্যক্তিগত আলোচনায়।
সিনেমার গল্পের কেন্দ্রে সান ফ্রান্সিসকোর দম্পতি জো ও অ্যাঞ্জেলা। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ভালো করার উদ্দেশ্যে তাঁরা পাশের বাসার দম্পতি পিনা ও হককে ডিনারের আমন্ত্রণ জানান।
প্রথমদিকে চারজনের কথাবার্তা বেশ স্বাভাবিকভাবেই এগোয়। নিজেদের কাজ, জীবন ও নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে গল্প করেন তাঁরা। কিন্তু রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আলোচনার বিষয় বদলে যেতে থাকে। একপর্যায়ে কথোপকথন গিয়ে পৌঁছায় দাম্পত্য সম্পর্ক ও যৌনজীবনের মতো ব্যক্তিগত বিষয়ে।
এরপর পিনা ও হকের পক্ষ থেকে আসে অপ্রত্যাশিত একটি প্রস্তাব। সেই মুহূর্ত থেকেই সিনেমার গল্প নতুন মোড় নেয় এবং চার চরিত্রের সম্পর্কের ভেতরের নানা টানাপোড়েন ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে।
সিনেমাটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর ভিন্নধর্মী টোন। বাইরে থেকে এটি হাস্যরসাত্মক মনে হলেও গল্পের ভেতরে রয়েছে দাম্পত্যের হতাশা, অপূর্ণতা, মানসিক চাপ এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা সংকট।
জো চরিত্রে সেথ রোগান একজন হতাশাগ্রস্ত সংগীতশিক্ষকের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। একসময় ব্যান্ডে কাজ করলেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পাওয়ায় তাঁর মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। পিঠের ব্যথা, দীর্ঘদিনের বিষণ্নতা এবং পেশাগত ব্যর্থতা তাঁকে আরও বিরক্ত ও খিটখিটে করে তুলেছে।
অন্যদিকে অ্যাঞ্জেলা সংসারকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেন। তবে নিজের অপূর্ণতা ও হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের কারণে তিনিও মানসিকভাবে অস্থির। ফলে দুজনের সম্পর্কের ভেতরের দূরত্বও গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
জো চরিত্রের কথাবার্তা ও আচরণে অনেকটা উডি অ্যালেন কিংবা ল্যারি ডেভিডের রসবোধের ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়। চরিত্রটি যেমন বিরক্তিকর, তেমনি তার মন্তব্য ও যুক্তিতর্ক অনেক সময় দর্শককে হাসায়।
চার চরিত্রের মধ্যে কথোপকথনও সিনেমাটির বড় আকর্ষণ। বাস্তব জীবনের মতোই অনেক সময় একজনের কথা শেষ হওয়ার আগেই আরেকজন কথা শুরু করে। বুদ্ধিদীপ্ত পাল্টা জবাব ও ব্যক্তিগত খোঁচায় ডিনারের পরিবেশ ধীরে ধীরে আরও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।
অভিনয়ের দিক থেকেও চার শিল্পীর পারফরম্যান্স প্রশংসনীয়। সেথ রোগান তাঁর পরিচিত রসবোধের সঙ্গে জো চরিত্রের হতাশা ফুটিয়ে তুলেছেন। অলিভিয়া ওয়াইল্ড অ্যাঞ্জেলার আকাঙ্ক্ষা, অসন্তুষ্টি ও অপূর্ণ স্বপ্নের দিকগুলো তুলে ধরেছেন। এডওয়ার্ড নর্টনের হক চরিত্র শুরুতে হাসির জন্ম দিলেও পরবর্তী সময়ে তার ব্যক্তিগত জীবনের গল্প দর্শককে অন্যভাবে ভাবায়। আর পিনা চরিত্রে পেনেলোপে ক্রুজ পুরো ঘটনার অন্যতম চালিকাশক্তি।
তবে সিনেমাটি পুরোপুরি নিখুঁত নয়। বিশেষ করে প্রথমার্ধে গল্পের গতি কিছুটা ধীর এবং দর্শককে আকৃষ্ট করার চেষ্টা অনেক সময় কৃত্রিম মনে হতে পারে। কিন্তু গল্প যত এগোয়, নির্মাণ তত বেশি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। তখন সিনেমাটিকে সিনেমা হিসেবে নয়, বরং কয়েকজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবন দেখার মতো মনে হয়।
সব মিলিয়ে ‘দ্য ইনভাইট’ একটি সীমিত পরিসরের গল্পের মাধ্যমে মধ্যবিত্ত দাম্পত্য জীবনের অসন্তুষ্টি, সম্পর্কের জটিলতা, যৌনতা, ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ও সামাজিক ভদ্রতার আড়ালে থাকা নানা দ্বন্দ্ব তুলে ধরে।
মাত্র চারটি প্রধান চরিত্র ও সীমিত একটি পরিসরকে ব্যবহার করে গল্পকে আকর্ষণীয় করে তোলাই সিনেমাটির অন্যতম সাফল্য।