বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬
১৯ ভাদ্র ১৪৩৩

সদ্যপ্রাপ্ত

>> গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট কাটাতে সময় লাগতে পারে, চুরি-লুটপাট বন্ধে নয়: ক্যাব সভাপতি

>> নভেম্বরে চার জাতির টুর্নামেন্টে ব্রাজিলের মুখোমুখি জাপান

>> আত্মশুদ্ধির পথে নিভৃত ইবাদতের গুরুত্ব

>> বন্যা-ভাঙন ঠেকাতে ‘জাদুর ঘাস’ ব্যবহারের পরিকল্পনা সরকারের

>> দিশা সালিয়ানের মৃত্যুতে নতুন মোড়, সিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ বম্বে হাইকোর্টের

>> বাস ভাঙচুর ও শ্রমিকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে জামালপুরে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট

>> সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে ১০ মৃত্যু, সরকারি সংস্থার গাফিলতি পায়নি তদন্ত কমিটি

>> নাটোরে বৃষ্টির সুযোগে চেম্বারে ঢুকে হোমিও চিকিৎসককে কুপিয়ে হত্যা

>> মেসির ইনস্টাগ্রাম পোস্টে ‘গোট’ বিতর্কের ইতি!

>> হরমুজ প্রণালির নাম বদলে ‘ট্রাম্প প্রণালি’ করতে চান ট্রাম্প

আপনি পড়ছেন : অর্থনীতি

বন্যা-ভাঙন ঠেকাতে ‘জাদুর ঘাস’ ব্যবহারের পরিকল্পনা সরকারের


Rabeya ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১:২৩



বন্যা-ভাঙন ঠেকাতে ‘জাদুর ঘাস’ ব্যবহারের পরিকল্পনা সরকারের


বন্যার পানি, নদীর স্রোত ও ঢেউয়ের কারণে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক, বাঁধ ও নদীর তীর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব স্থাপনা রক্ষায় কংক্রিট, পাথর ও জিও ব্যাগের মতো ব্যয়বহুল পদ্ধতি ব্যবহার করা হলেও এবার পরিবেশবান্ধব একটি প্রাকৃতিক সমাধানের দিকেও নজর দিচ্ছে সরকার। এ ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় হিসেবে সামনে এসেছে ‘বিন্না ঘাস’।

গ্রামাঞ্চলের রাস্তার পাশ, চর ও পরিত্যক্ত জমিতে সাধারণত এই ঘাস দেখা যায়। মাটির গভীরে ছড়িয়ে থাকা এর শক্ত শিকড় মাটিকে শক্তভাবে আঁকড়ে রাখে। ফলে পানির প্রবাহ ও ঢেউয়ের আঘাতে মাটির ক্ষয় কমাতে সড়ক, বাঁধ ও নদীতীরে এটি ব্যবহার করা যায় কি না, তা নিয়ে কাজ চলছে।

গত ১৭ আগস্ট সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় সড়ক ও বাঁধের ক্ষয় রোধে বিন্না ঘাস ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। সভায় ঘাসটির ব্যবহার নিয়ে একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সহ-উপাচার্য ও পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম। বিন্না ঘাস নিয়ে তাঁর গবেষণাও রয়েছে।

সভায় বিভিন্ন সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে এই ঘাস ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত হয়। কোন কোন প্রকল্পে এটি কার্যকর হতে পারে, তা পর্যালোচনার জন্য অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের নেতৃত্বে একটি কারিগরি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিন্না ঘাস ব্যবহারের জন্য নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিতে পরিকল্পনা কমিশনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এরই মধ্যে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ), স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা পরীক্ষামূলকভাবে বিন্না ঘাস রোপণ শুরু করেছে।

বিন্না ঘাসের ইংরেজি নাম ভেটিভার গ্রাস। বৈজ্ঞানিকভাবে এটি ভেটিভেরিয়া জিজানিওইডিস বা ক্রাইসোপোগন জিজানিওইডিস নামে পরিচিত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাসখাস, খসখস, বেন্না বা শণ নামেও ঘাসটি পরিচিত।

ভেটিভার ঘাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য এর শিকড়। মাটির নিচে শক্ত ও গভীরভাবে বিস্তৃত শিকড়গুলো অনেকটা প্রাকৃতিক জালের মতো কাজ করে। এতে মাটির কণাগুলো আটকে থাকে এবং পানির গতি কমে যাওয়ায় মাটি সহজে ধুয়ে যেতে পারে না। এ কারণেই গবেষকেরা একে অনেক সময় ‘জাদুর ঘাস’ বলে থাকেন।

বুয়েটের গবেষণায় বিন্না ঘাসের শিকড় ও মাটির সংযোগকে নোঙরের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। শিকড় মাটির কণাগুলো ধরে রেখে মাটির প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়। পাশাপাশি ঘাসের ঘন গোছা মাটির ওপর একটি উদ্ভিদপ্রাচীর তৈরি করে, যা পানির প্রবাহ কমিয়ে পলি ধরে রাখতে সহায়তা করে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, শিকড়যুক্ত মাটির গড় সহনশীলতা শিকড়বিহীন মাটির তুলনায় প্রায় ৭৮ শতাংশ বেশি। একইভাবে শিকড় থাকা মাটি শিকড়বিহীন মাটির চেয়ে প্রায় ৫১৫ শতাংশ বেশি বিকৃতি সহ্য করতে পারে। অর্থাৎ বিন্না ঘাস শুধু মাটিকে শক্ত করে না, চাপ ও নড়াচড়ার বিরুদ্ধেও এর স্থায়িত্ব বাড়ায়।

বিভিন্ন ধরনের মাটি ও কঠিন জলবায়ুতেও বিন্না ঘাস টিকে থাকতে পারে। অস্ট্রেলিয়া, চীন, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামসহ বিশ্বের শতাধিক দেশে মাটির ক্ষয় নিয়ন্ত্রণ ও ঢালের স্থিতিশীলতা বাড়াতে এই ঘাস ব্যবহারের নজির রয়েছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকাতেও ঘাসটির স্বাভাবিক বিস্তার দেখা যায়।

দেশে অবশ্য বিন্না ঘাস ব্যবহারের পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নতুন নয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে এলজিইডি দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১৭১ কিলোমিটার সড়কে এই ঘাস রোপণ করে। এখন সংস্থাটি দেশের আরও বেশি সড়কে এর ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।

সওজও কয়েক বছর ধরে ঘাসটির কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করছে। কুমিল্লার টমছম ব্রিজ থেকে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ পর্যন্ত আঞ্চলিক মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের আওতায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে সড়কের শোল্ডার ও ঢালের প্রায় সাড়ে ৩০০ মিটার এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে বিন্না ঘাস লাগানো হয়।

সওজ সূত্র অনুযায়ী, রোপণের সময় ঘাসগুলোর উচ্চতা ছিল ৬ থেকে ৭ ইঞ্চি। বর্তমানে সেগুলো প্রায় ৩ ফুট পর্যন্ত বেড়েছে। আশপাশের এলাকায় বীজ ছড়িয়ে ঘাসটির স্বাভাবিক বিস্তারও ঘটেছে।

সওজের অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রায় সাত বছর ধরে এই এলাকায় ঘাসটির কার্যকারিতা দেখা হয়েছে। ভারী বৃষ্টি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরও যেখানে বিন্না ঘাস লাগানো হয়েছে, সেখানে সড়কের পাশ ও ঢালের মাটি তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাটির ক্ষয় ও ছোটখাটো ভূমিধসও কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংস্থাটির মতে, সড়কের পাশ ও ঢালের স্থায়িত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি এ ধরনের প্রাকৃতিক ব্যবস্থা ভবিষ্যতে রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন ও ব্যয় কমাতে সহায়ক হতে পারে। সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়া পর্যন্ত নতুন রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পেও বিন্না ঘাস ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে বলে রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে গত ১৬ আগস্ট রাজধানীর পানি ভবনে ‘বিন্না ঘাস পলিসি ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, নদীভাঙন, মাটির ক্ষয় ও ভূমির অবক্ষয় মোকাবিলায় বিন্না ঘাস কম খরচে পরিবেশবান্ধব একটি প্রাকৃতিক সমাধান হতে পারে।

তিনি বলেন, নদীর তীর, বাঁধের ঢাল, হাওর এবং ক্ষয়প্রবণ এলাকায় পরিকল্পিতভাবে বিন্না ঘাস লাগানো গেলে মাটির স্থায়িত্ব বাড়ানো সম্ভব। সভায় বিন্না ঘাসের ব্যবহার, কার্যকারিতা ও সম্ভাবনা নিয়ে পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপন করেন বুয়েটের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম।

সরকারি বিভিন্ন সংস্থার পরীক্ষামূলক উদ্যোগ ও গবেষণার ফল বিবেচনায় নিয়ে এখন বন্যা, নদীভাঙন ও মাটির ক্ষয় নিয়ন্ত্রণে বিন্না ঘাসকে আরও ব্যাপকভাবে ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে।