দীর্ঘ সময় ধরে চলা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে দেশের নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন খাতে। রড, সিমেন্ট, সিরামিক টাইলস, কাচ ও ইটসহ বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় অর্ধেকেরও কম পণ্য তৈরি হচ্ছে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী বাজারে সরবরাহ করতেও সমস্যায় পড়ছে কিছু প্রতিষ্ঠান।
নির্মাণ খাতের ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, গত দুই বছর ধরেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে নির্মাণকাজে ধীরগতি রয়েছে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প কমে যাওয়ায় রড, সিমেন্ট ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর চাহিদাও আগের তুলনায় কমেছে। এর মধ্যেই এক মাসের বেশি সময় ধরে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার পাশাপাশি লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় অনেক কারখানা স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে না। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন অর্ধেকের নিচে নেমেছে, আবার কিছু কারখানার নির্দিষ্ট ইউনিট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি কোম্পানিগুলোর আর্থিক চাপও বাড়ছে।
সম্প্রতি এলএনজি সরবরাহের একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর শিল্পকারখানায় গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়। পরবর্তীতে কয়েকটি টার্মিনাল চালু হলেও সরবরাহ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। কার্গো সংকটের কারণে একটি টার্মিনাল থেকে আবারও গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকার পর সেটি পুনরায় চালু করা হয়। এরপর কিছু এলাকায় গ্যাসের সরবরাহ বাড়লেও শিল্পকারখানাগুলো এখনো পুরোপুরি স্বস্তিতে নেই।
গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে টাইলস ও কাচশিল্প। এরপর রয়েছে রড ও সিমেন্ট উৎপাদন। লোডশেডিংয়ের কারণে অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর কারখানাতেও উৎপাদন কমেছে।
ইস্পাত খাতের সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে পরিচালিত প্রায় ৪০টি স্টিল কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান। এসব কারখানায় বছরে এক কোটির বেশি টন রড উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও দেশের বার্ষিক চাহিদা আনুমানিক ৬৫ থেকে ৭৫ লাখ টন। অর্থাৎ সক্ষমতার বড় একটি অংশ আগে থেকেই অব্যবহৃত ছিল।
ঢাকার কোনাপাড়ার একটি স্টিল কারখানায় প্রতিদিন কয়েক শ টন রড উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সেখানে উৎপাদন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, নির্মাণ মৌসুম সামনে থাকায় রডের চাহিদা বাড়তে পারে। কিন্তু তার আগে উৎপাদন স্বাভাবিক করা না গেলে বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়ে দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সিরামিক কারখানা রয়েছে। এসব কারখানার বড় একটি অংশ বর্তমানে গ্যাস সংকটে ভুগছে। পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় অনেক কারখানার সব ইউনিট একসঙ্গে চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
একটি সিরামিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তার মতে, গ্যাসের চাপ কমে গেলে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় থাকা পণ্যের মান ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে উৎপাদনরত পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে একটি প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক সক্ষমতার মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
গাজীপুরের শ্রীপুরের একটি সিরামিক কারখানার চারটি ইউনিটের মধ্যে তিনটি প্রায় ১৭ দিন বন্ধ ছিল। পরে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়ায় একটি ইউনিট চালু করা হয়। কারখানাটির দৈনিক প্রায় তিন লাখ বর্গফুট টাইলস উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।
সিরামিক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, সংকট দ্রুত না কাটলে বাজারে চাহিদা অনুযায়ী টাইলস সরবরাহ করা কঠিন হবে। তখন আমদানিনির্ভরতা বাড়তে পারে। আমদানি বাড়লে বাড়তি দামে পণ্য কিনতে হতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বাড়ি নির্মাণের ব্যয়ে।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সিমেন্ট উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দেশে বর্তমানে কয়েক ডজন সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বছরে দেশের সিমেন্টের চাহিদা প্রায় চার কোটি টন হলেও উৎপাদন সক্ষমতা এর দ্বিগুণের বেশি।
শিল্প মালিকদের বক্তব্য, গ্যাসের চাপ হঠাৎ কমে গেলে কারখানার যন্ত্রপাতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। উৎপাদন চালু রাখতে অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে, এতে খরচ বাড়ছে। পাশাপাশি ঘন ঘন জেনারেটর চালানোর কারণেও যন্ত্রপাতির ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা আরও বলছেন, গত দুই বছরে সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড কমে যাওয়ায় নির্মাণসামগ্রীর সামগ্রিক চাহিদা কমেছে। ফলে নতুন করে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেয়নি অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান।
তাঁদের মতে, প্রবাসী আয় ও গ্রামীণ অর্থনীতির কিছুটা ইতিবাচক পরিস্থিতির কারণে নির্মাণ খাত এখনো টিকে আছে। তবে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট দীর্ঘ হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় রেশনিংসহ বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। তাঁদের মতে, শিল্পমালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে সরবরাহের একটি কার্যকর পরিকল্পনা করা গেলে সীমিত জ্বালানির মধ্যেও বিভিন্ন খাতে উৎপাদন সচল রাখা সম্ভব হবে।