ভারতের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক—দুই বিষয় একসঙ্গে সামলানো ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। কম দামে পর্যাপ্ত জ্বালানি নিশ্চিত করতে ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ তেল কিনছে। অন্যদিকে, রাশিয়ার জ্বালানি কেনা দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেওয়ার পর দিল্লির ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
নতুন মার্কিন আইনে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল ও অন্যান্য জ্বালানি কেনা দেশগুলোর পণ্যে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে ভারতীয় পণ্যের ওপর কখন বা আদৌ এই শুল্ক আরোপ করা হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ভারত নিজেদের প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ৯০ শতাংশের বেশি আমদানি করে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে তেল সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় রাশিয়ার ওপর ভারতের নির্ভরতা আরও বেড়েছে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি গ্রীষ্মে ভারতের আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের প্রায় অর্ধেক এসেছে রাশিয়া থেকে।
রাশিয়ার তেল কেনা কমানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই ভারতের ওপর চাপ দিয়ে আসছে। গত ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে একটি বাণিজ্যচুক্তির আলোচনা হয়েছিল, যেখানে ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমাতে রাজি হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এরপর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহের হিসাবও পাল্টে যায়।
ইরান যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল সরবরাহে সমস্যা তৈরি হলে ভারতের জন্য রুশ তেলের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ভারতসহ কয়েকটি দেশকে রাশিয়া থেকে বেশি তেল কেনার অনুমতিও দিয়েছিল।
এখন আবার রুশ তেল কেনা নিয়ে ভারতের ওপর চাপ তৈরি হওয়ায় দিল্লিকে নতুন করে পরিস্থিতি সামলাতে হচ্ছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের অগ্রাধিকার। দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়ও বলেছে, বাজারের পরিস্থিতি বিবেচনায় বিভিন্ন উৎস থেকে তেল কেনা এবং জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
ভারত আরও সতর্ক করেছে, নতুন মার্কিন আইনের প্রভাব শুধু দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে, জ্বালানি ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে ভারতের অভ্যন্তরীণ চাহিদার রান্নার গ্যাসের প্রায় ৮ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসত। বর্তমানে তা ৫০ শতাংশের বেশি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতের সাবেক বাণিজ্য কর্মকর্তা অজয় শ্রীবাস্তব মনে করেন, নতুন মার্কিন শুল্কের কারণে ভারতের কিছু রপ্তানিকারক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তবে শুল্কের ফলে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্যের দামও বাড়তে পারে বলে তাঁর মত।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যচুক্তি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। নতুন মার্কিন আইন আলোচনার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। তবে কোনো বাণিজ্যচুক্তি হলেও ভবিষ্যতে শুল্ক বা চুক্তির শর্ত নিয়ে আবার বিরোধ তৈরি হবে কি না, তা নিয়েও ভারতের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
নতুন মার্কিন আইন শুধু ভারত নয়, রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ তেল কেনা চীনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ফলে ওয়াশিংটন ভারতের পাশাপাশি চীনের ওপর একই ধরনের চাপ প্রয়োগ করে কি না, সেটিও নয়াদিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
ভারত দীর্ঘদিন ধরে চীনের প্রভাব মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করেছে। আবার একই সময়ে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি সম্পর্ক রয়েছে। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক—সবগুলো বিষয় বিবেচনায় নিয়েই ভারতকে সামনে এগোতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তনশীল হওয়ায় ভবিষ্যতের কোনো সমঝোতা কতটা স্থায়ী হবে, সেটিও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ফলে রাশিয়ার তেল কেনা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করেই দিল্লিকে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।