সরকারি চাকরিতে পদোন্নতি একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। তবে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম, দুর্নীতি কিংবা শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ থাকার পরও যদি তিনি পদোন্নতি পান, তাহলে সেই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ—বিআরটিএ’র মোটরযান পরিদর্শক মোহাম্মদ জমির হোসেনকে ঘিরে এমনই প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব পালনকালে দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ ও অনৈতিক লেনদেনের ঘটনায় বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে তিনি পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে যশোর সার্কেলের সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বিআরটিএ’র বিভিন্ন কার্যালয়ে দালালদের প্রবেশ ও অনৈতিক কার্যক্রম বন্ধে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে একাধিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি বিআরটিএ’র বিভিন্ন দপ্তরে দালাল প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় ঢাকা জেলা সার্কেল (ইকুরিয়া)-এ কর্মরত ছিলেন মোটরযান পরিদর্শক মোহাম্মদ জমির হোসেন। তাঁর দায়িত্ব পালনকালে দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ সামনে আসে।
২০২৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৩টা ৪৩ মিনিটের দিকে বিআরটিএ’র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের বিআরটিসি বাস ডিপো এলাকায় অবস্থিত ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা কেন্দ্রে অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অভিযানের সময় পরীক্ষা কেন্দ্রের একটি কক্ষ থেকে অনৈতিক লেনদেনের অর্থসহ কয়েকজনকে আটক করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেন।
পরবর্তী তদন্তে মোটরযান পরিদর্শক জমির হোসেনের সঙ্গে ওই দালালদের যোগাযোগ এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার দাবি করা হয়। এ ঘটনাকে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর আওতায় অসদাচরণ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এরপর ২০২৩ সালের ৪ মার্চ তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একই সময়ে জারি করা একটি বদলি আদেশের মাধ্যমে তাঁকে ঢাকা থেকে বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ে বদলি করা হয়।
সাময়িক বরখাস্ত ও বিভাগীয় অভিযোগের পরও পরবর্তী সময়ে তাঁর পদোন্নতি কীভাবে হলো—এ নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ে যোগদানের পর জমির হোসেনের পদোন্নতি নিয়ে নেপথ্যে তৎপরতা শুরু হয়। এমনকি সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা ও দপ্তরের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তিনি পদোন্নতির পথ তৈরি করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের নথি বা প্রমাণ রয়েছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে তাঁর পদোন্নতি ও সংশ্লিষ্ট অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। এরপরও তাঁর বিরুদ্ধে নতুন কোনো দৃশ্যমান বিভাগীয় ব্যবস্থা না নিয়ে পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
বর্তমানে তিনি বিআরটিএ’র যশোর সার্কেলের সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
পদোন্নতির পর তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
বর্তমানে যশোর সার্কেলের দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি সাতক্ষীরা সার্কেলের অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই দুই সার্কেলে অধীনস্থ মোটরযান পরিদর্শকদের মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি হয়েছে। ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস সনদ এবং রুট পারমিট সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রত্যক্ষ প্রমাণের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
বিআরটিএ একটি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। ফলে এই প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, দালালনির্ভরতা কিংবা অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে জমির হোসেনের বিরুদ্ধে পূর্বের বিভাগীয় ব্যবস্থা, সাময়িক বরখাস্ত, পরবর্তী পদোন্নতি এবং বর্তমানে যশোর ও সাতক্ষীরায় দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলো পর্যালোচনার দাবি উঠেছে।
অভিযোগগুলো সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল।