‘ওরা আমাকে মেরে ফেলবে’—সন্তান জন্মের আগে এক প্রসূতি নারীর এমন আর্তনাদের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটির সঙ্গে দাবি করা হচ্ছে, এর পরপরই ওই নারী ও তাঁর নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ঘটনাটি বাংলাদেশের নয়, ঘটেছে ভারতের মধ্যপ্রদেশে।
যাচাই করে জানা গেছে, ভিডিওটি ভারতের মধ্যপ্রদেশের রেওয়া জেলার সঞ্জয় গান্ধী মেমোরিয়াল হাসপাতালের। সেখানে ২৫ বছর বয়সী কল্পনা মিশ্র সন্তান জন্ম দেওয়ার আগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্বজনদের কাছে তাঁকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার আকুতি জানিয়েছিলেন। পরে কল্পনা ও তাঁর নবজাতকের মৃত্যু হয়।
ভিডিওতে দেখা যায়, হাসপাতালের একটি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে কল্পনা কান্নাকাটি করছেন এবং স্বজনদের তাঁকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করছেন। হাসপাতালের কর্মীরা তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করেন এবং পরে আবার ভেতরে নিয়ে যান।
ভিডিওটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। বাংলাদেশেও বিভিন্ন ফেসবুক পোস্ট, ফটোকার্ড ও থাম্বনেইলে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই ঘটনাস্থল হিসেবে ভারতের কোনো পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি। ফলে ভিডিওটি বাংলাদেশের কোনো হাসপাতালের—এমন ধারণা তৈরি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৫ আগস্ট রাতে রেওয়ার সঞ্জয় গান্ধী মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি হন কল্পনা মিশ্র। পরদিন রাতে তাঁর সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার হয় এবং তিনি সন্তান জন্ম দেন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কল্পনা ও তাঁর নবজাতকের মৃত্যু হয়।
কল্পনার পরিবারের পক্ষ থেকে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তোলা হয়েছে। তাঁর বাবা রামশরণ মিশ্রের দাবি, কল্পনা চিকিৎসার জন্য বারবার অনুরোধ করলেও যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। পরিবারের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার পর কল্পনা আর জ্ঞান ফিরে পাননি।
তবে চিকিৎসকদের অবহেলার কারণেই মা ও নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে—এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো পাওয়া যায়নি। বিষয়টি তদন্তাধীন।
হাসপাতালের ডিন সুনীল আগরওয়াল জানিয়েছেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। পরিবারের পক্ষ থেকে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, তদন্ত কমিটি সেগুলো খতিয়ে দেখবে। কল্পনা অচেতন হওয়ার পর কেন আর জ্ঞান ফিরে পাননি, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
অন্যদিকে হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট রাহুল মিশ্র চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, নির্ধারিত চিকিৎসা প্রটোকল অনুসরণ করেই কল্পনার চিকিৎসা করা হয়েছিল।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, গর্ভাবস্থায় কল্পনা প্রয়োজনীয়সংখ্যক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাননি। তাঁর নথিতে মাত্র দুটি পরীক্ষার তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে হাসপাতাল।
চিকিৎসা নথিতে কল্পনার শারীরিক অবস্থার কিছু জটিলতার কথাও উঠে এসেছে। তাঁর রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম ছিল। একই সঙ্গে রক্তচাপ বেশি এবং লিভারের এনজাইমের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। তবে এগুলোর কোনোটিকেই এখন পর্যন্ত মৃত্যুর চূড়ান্ত কারণ হিসেবে নিশ্চিত করা হয়নি।
ঘটনার প্রাথমিক তদন্তের পর দুই চিকিৎসক ও দুই নার্সিং কর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক সোনাল আগরওয়াল ও অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের নিধি পান্ডের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে অবহেলা ও দায়িত্বে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগের কথা জানানো হয়েছে। পরিবারের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগে দুই নার্সিং কর্মীর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ঘটনাটি তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে কারও দায় প্রমাণিত হলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ঘটনাটি বাস্তব হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তির মূল কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন পোস্ট ও ফটোকার্ডে ঘটনাস্থলের পরিচয় বাদ দেওয়া হয়েছে। ভিডিওর সঙ্গে শুধু প্রসূতির আর্তনাদ এবং পরে মা ও নবজাতকের মৃত্যুর তথ্য দেওয়া হয়েছে।
ফলে নিউজফিডে ভিডিও বা ফটোকার্ড দেখেই কেউ ঘটনাটি বাংলাদেশের কোনো হাসপাতালের বলে ধরে নিতে পারেন। অথচ মূল ঘটনা ভারতের মধ্যপ্রদেশের রেওয়া জেলার।
অর্থাৎ, ভিডিওটি বা মা-নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা মিথ্যা নয়; বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে ঘটনার স্থান ও প্রেক্ষাপট উল্লেখ না করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার কারণে।