দেশের বিভিন্ন সীমান্তপথ ব্যবহার করে মাদক ঢোকার পর তা ছড়িয়ে পড়ছে বড় শহর ও মহানগরগুলোতে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানের তথ্য এবং বিচারাধীন মামলার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বড় নগরগুলো মাদকের গুরুত্বপূর্ণ বাজারে পরিণত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন।
এর সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী তিন লাখ ইয়াবার চালান। গত ১৭ আগস্ট কক্সবাজার থেকে একটি ল্যান্ডক্রুজার প্রাডোতে ইয়াবাগুলো ঢাকার উদ্দেশে নেওয়া হচ্ছিল। চট্টগ্রামে এক রাত অবস্থানের পর গাড়িটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে উঠলে কুমিল্লায় সেটি আটক করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ মাসে কক্সবাজারের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় পৃথক ছয়টি অভিযানে প্রায় ২৭ লাখ ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে। এসব চালানের মধ্যে পাঁচটির সম্ভাব্য গন্তব্য ছিল ঢাকা। সেখান থেকে মাদক দেশের অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলে জানা গেছে।
কর্মকর্তাদের মতে, কেবল সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে মাদক পাচার পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। কারণ সীমান্ত অতিক্রম করার পর বিভিন্ন পরিবহন রুট ধরে চালানগুলো প্রথমে বড় শহরে পৌঁছায়। পরে সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
দেশের আটটি মহানগর—ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, গাজীপুর, রংপুর, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট—এখন মাদকের অন্যতম বড় বাজার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আইন মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসব আট মহানগরে ন্যূনতম পাঁচ বছর বা তার বেশি শাস্তিযোগ্য গুরুতর মাদক মামলা বিচারাধীন রয়েছে ৪৭ হাজার ৯৪৮টি। সারাদেশে এ ধরনের বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৩৩। অর্থাৎ মোট মামলার প্রায় ২৯ শতাংশই আট মহানগরের।
পরিসংখ্যান বলছে, যেসব জেলা দিয়ে মাদক প্রবেশ করে কিংবা দেশের ভেতরে পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেসব এলাকাতেও গুরুতর মাদক মামলার সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।
আট মহানগরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুতর মাদক মামলা বিচারাধীন রয়েছে ঢাকা মহানগরে—২১ হাজার ৯২০টি। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর, যেখানে মামলার সংখ্যা ১৫ হাজার ৪৪টি। অর্থাৎ শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রামেই মোট ৩৬ হাজার ৯৬৪টি মামলা রয়েছে, যা আট মহানগরের মোট মামলার প্রায় ৭৭ শতাংশ।
অন্য মহানগরগুলোর মধ্যে রাজশাহীতে ৪ হাজার ১২১, গাজীপুরে ২ হাজার ৬২৩, রংপুরে ১ হাজার ২১৮, খুলনায় ১ হাজার ১৮৭, বরিশালে ১ হাজার ২১ এবং সিলেটে ৮১৪টি গুরুতর মাদক মামলা চলমান।
মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা কক্সবাজার ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ বা আইস প্রবেশের অন্যতম প্রধান পথ হিসেবে পরিচিত। চলতি বছরের ১১ এপ্রিল নাফ নদীসংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিজিবি ১০ লাখ ৫৯ হাজার ৪০০ ইয়াবা উদ্ধার করে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এক দিনে ইয়াবা উদ্ধারের ক্ষেত্রে এটি তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অভিযানগুলোর একটি।
এর পরও উখিয়া, টেকনাফ ও রামু এলাকায় বড় চালান আটকের ঘটনা ঘটেছে। কক্সবাজার থেকে মাদক সাধারণত চট্টগ্রাম হয়ে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় যাওয়ার চেষ্টা করে বলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
গত ১০ এপ্রিল কক্সবাজার থেকে আসা একটি মাছ ধরার ট্রলারে চট্টগ্রাম নগরে পাঁচ লাখ ইয়াবা জব্দ করা হয়। চট্টগ্রাম মহানগরও গুরুতর মাদক মামলার সংখ্যায় দেশের শীর্ষ এলাকাগুলোর একটি।
এরপর বড় একটি পরিবহন করিডর হলো কুমিল্লা। কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার দিকে যাওয়া চালানের একটি অংশ এই জেলা দিয়ে অতিক্রম করে। আগস্টে তিন লাখ ইয়াবার চালান এবং এর আগে জুনে একটি গাড়ি থেকে এক লাখ ৬০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা এ পথের গুরুত্ব তুলে ধরে। কুমিল্লায় বর্তমানে বিচারাধীন গুরুতর মাদক মামলার সংখ্যা ১০ হাজার ৪৬৪টি।
রাজধানীমুখী পরিবহনে নারায়ণগঞ্জও গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশাপাশি নৌপথ থাকায় বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রাজধানীতে মাদক নেওয়ার ক্ষেত্রে জেলাটি ব্যবহার করা হয়। সেখানে বিচারাধীন গুরুতর মাদক মামলা রয়েছে ৭ হাজার ৪১১টি।
সীমান্তবর্তী ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এই ধরনের মামলা ৫ হাজার ৯২৭টি, রাজশাহী জেলায় ৫ হাজার ১২৬টি এবং দিনাজপুরে ৪ হাজার ১৪৮টি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় মহানগরগুলোতে মাদকের ক্রেতাও বেশি। পাশাপাশি বিস্তৃত সড়ক, নৌ ও রেল যোগাযোগের কারণে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চালান সরানো তুলনামূলক সহজ।
বড় শহরে ভাড়া বাসা, অস্থায়ী আবাসন ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার সুযোগ নিয়ে মাদক মজুত করাও পাচারকারীদের জন্য সহজ হয়। ফলে সীমান্ত থেকে আসা চালান বড় নগরগুলোতে ঢোকার পর সেগুলো বিভিন্ন খুচরা বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফের মতে, সীমান্ত দিয়ে প্রায় সব ধরনের মাদকই দেশে প্রবেশ করে। সীমান্ত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বেশি থাকায় বড় চালানও সেখানে বেশি ধরা পড়ে।
ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে মাদক মামলার সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি এসব এলাকায় অধিক জনসংখ্যা, বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ভাসমান মানুষের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, সীমান্ত দিয়ে মাদক ঢুকলেও বড় ভোক্তা ও বাজার হিসেবে শেষ পর্যন্ত রাজধানীসহ বড় শহরগুলোই সামনে আসে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশে চোরাচালানের মাধ্যমে প্রবেশ করা মাদকের সর্বোচ্চ প্রায় ২০ শতাংশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। অর্থাৎ বড় একটি অংশই শনাক্ত ও উদ্ধার করা সম্ভব হয় না।
গত বছর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি ও রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস লিমিটেডের গবেষণায় দেশে অবৈধ মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৮১ লাখ ৯৫ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়। গবেষণায় আরও বলা হয়, মাদক ব্যবহারকারীরা বছরে আনুমানিক ৫৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেন। প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, তারা সহজেই মাদক সংগ্রহ করতে পারেন।
গুরুতর মাদক মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে সরকার সম্প্রতি ১০টি জেলা ও মহানগর এলাকার জন্য ২২টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে। ৩ সেপ্টেম্বর জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ন্যূনতম পাঁচ বছর বা তার বেশি মেয়াদের সাজাযোগ্য চলমান মাদক মামলাগুলো নির্ধারিত ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হবে।
আইন মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এসব এলাকায় বিচারাধীন গুরুতর মাদক মামলার সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২ হাজার ৫৪০টি। অর্থাৎ সারাদেশের এ ধরনের মামলার প্রায় ৬২ শতাংশ নতুন ট্রাইব্যুনালের আওতায় আসবে।
ঢাকা জেলার জন্য একটি এবং মহানগরের বিভিন্ন থানার জন্য চারটি ট্রাইব্যুনাল করা হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগরের জন্য রয়েছে মোট চারটি। কক্সবাজারে তিনটি, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লায় দুটি করে এবং রাজশাহী জেলা ও মহানগরের জন্য দুটি ট্রাইব্যুনাল নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বগুড়া, দিনাজপুর ও যশোরে একটি করে ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে।
আইনে মাদক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক মামলাই বছরের পর বছর ধরে চলছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৫১ ধারায় নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ করার বিধান রয়েছে। সাধারণভাবে ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করার কথা; বিশেষ পরিস্থিতিতে কয়েক ধাপে আরও সময় বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও মোট সময় ১৩৫ কার্যদিবসের বেশি হওয়ার কথা নয়।
কিন্তু বাস্তবে তদন্ত শেষ করতে দেরি, অভিযোগপত্র দিতে বিলম্ব, সাক্ষীর অনুপস্থিতি, তদন্ত কর্মকর্তার আদালতে হাজির না হওয়া, আলামত উপস্থাপনে জটিলতা এবং বিচারকের সংকটসহ নানা কারণে মামলা দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিভাগের পরিচালক ইকবাল মাসুদের মতে, বড় শহরগুলোতে ইতোমধ্যে মাদকের বড় ভোক্তাশ্রেণি তৈরি হয়েছে। সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের পর বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে এসব মাদক নগরাঞ্চলে পৌঁছে যাচ্ছে।
কোনো একটি সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হলে পাচারকারীরা অন্য পথ বেছে নিচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, সীমান্ত থেকে শহর পর্যন্ত যে পুরো সরবরাহব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, সেটি ভেঙে না দিলে শুধু সীমান্তে অভিযান চালিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
ফলে মাদক প্রতিরোধে সীমান্ত নজরদারির পাশাপাশি পরিবহন রুট, গুদাম, পাইকারি ও খুচরা বাজার এবং বড় শহরের বিতরণব্যবস্থায় সমন্বিত অভিযান ও নজরদারি বাড়ানো জরুরি হয়ে উঠেছে।