বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬
১৯ ভাদ্র ১৪৩৩

সদ্যপ্রাপ্ত

>> স্যাম্পল দেখেই দেশি-বিদেশি যন্ত্র বানান সৈয়দপুরের কারিগরেরা

>> বগুড়া মেডিকেলের বহির্বিভাগ বন্ধ, রোগী-স্বজনদের বিক্ষোভ

>> সাগরে আটকে রাতভর ফেরি, আড়াই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে লাগল ১৯ ঘণ্টা

>> ভারত প্রশ্নে বাংলাদেশের কৌশল কী হতে পারে?

>> মার্কিন মুদ্রায় ট্রাম্পের প্রতিকৃতি, শত বছর পর নতুন নজির

>> জানুয়ারিতে দুই পর্বে বিশ্ব ইজতেমা, তারিখ ঘোষণা

>> ফারজানা রুপার সঙ্গে সন্তানদের সাক্ষাতের অনুমতি ট্রাইব্যুনালের

>> ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে চিকিৎসা, চিকিৎসক সংকটে ব্যাহত কচুয়ার স্বাস্থ্যসেবা

>> উচ্চশিক্ষার নতুন গন্তব্য হয়ে উঠছে সিলেট

>> মেসির সম্মানে আর্জেন্টিনার ঘরোয়া ফুটবলে ১০ মিনিটে থামবে খেলা

আপনি পড়ছেন : সিলেট

উচ্চশিক্ষার নতুন গন্তব্য হয়ে উঠছে সিলেট


Rabeya ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ২:৫৫



উচ্চশিক্ষার নতুন গন্তব্য হয়ে উঠছে সিলেট


একসময় উচ্চশিক্ষার জন্য সিলেটের শিক্ষার্থীদের দেশের বাইরে কিংবা ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে যেতে হতো। বিশেষ করে ১৯৪৭ সালের আগ পর্যন্ত সিলেটের অনেক শিক্ষার্থী ভারতের আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় ও কলকাতার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করতেন। সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। এখন নিজ অঞ্চলেই উচ্চশিক্ষার বিস্তৃত সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সৈয়দ মোস্তফা আলীর আত্মকথার ভূমিকায় সিলেটের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার আগ্রহের ঐতিহাসিক চিত্র তুলে ধরেছিলেন সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ আবুল ফজল। ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত বইটির ভূমিকায় তিনি সৈয়দ মোস্তফা আলী, সৈয়দ মুর্তজা আলী ও সৈয়দ মুজতবা আলীর শিক্ষাজীবনের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন।

গত শতকের শেষভাগ পর্যন্ত উচ্চশিক্ষার জন্য সিলেটের শিক্ষার্থীদের ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহরে যেতে হতো। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সিলেটে উচ্চশিক্ষার নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।

১৯৯১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করা শাবিপ্রবি সিলেট অঞ্চলের প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। এর এক দশক পর ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় লিডিং ইউনিভার্সিটি। এরপর সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, নর্থ ইস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এবং আরটিএম আল-কবীর ইন্টারন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটিসহ আরও কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে।

এরপর একে একে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সিলেটের জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্টে আর্মি ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনেও উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে।

বর্তমানে সিলেট বিভাগের চার জেলার মধ্যে তিন জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজসহ উচ্চশিক্ষার বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে মৌলভীবাজারে এখনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজ নেই।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. খায়রুল ইসলাম বলেন, সিলেট অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার বিস্তারে শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে শাবিপ্রবি। শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের মান বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিসরে সংযোগ তৈরির জন্যও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আলিমুল ইসলাম জানান, কৃষি বিষয়ে দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরির পাশাপাশি গবেষক তৈরিতেও তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় কাজ করছে। দেশের কৃষির সামগ্রিক উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সিলেট অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে প্রায় ২৭ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। এর বাইরে সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, মুরারিচাঁদ কলেজ, মদনমোহন কলেজ, সিলেট সরকারি মহিলা কলেজসহ বিভিন্ন কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আরও অন্তত ৬৫ হাজার শিক্ষার্থী স্নাতক, স্নাতকোত্তরসহ বিভিন্ন পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অনেকের মতে, আগে উচ্চশিক্ষার জন্য দূরের শহরে যেতে হতো বলে অনেক শিক্ষার্থীই আগ্রহ হারাতেন। এখন সিলেটে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সেই বাধা অনেকটাই কমেছে। এখানকার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে কেউ কেউ নাসা, মাইক্রোসফট, ফেসবুক, গুগল ও অ্যামাজনের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন বলেও তাঁরা জানান।

তবে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটলেও পছন্দের বিষয়ে পড়ার সুযোগ এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত বলে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ মনে করে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয়কেন্দ্রিক পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। আবাসনসংকটও কিছু শিক্ষার্থীর জন্য সমস্যা তৈরি করছে। তারপরও শিক্ষার পরিবেশ ও মান নিয়ে বড় ধরনের অসন্তোষ নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য মোহাম্মদ জহিরুল হক মনে করেন, সিলেট ইতোমধ্যে দেশের সম্ভাবনাময় শিক্ষানগরী হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে উচ্চশিক্ষা অবকাঠামো গড়ে তোলা, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে সিলেট ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

চিকিৎসাশিক্ষাতেও এগিয়ে সিলেট

শুধু সাধারণ উচ্চশিক্ষা নয়, চিকিৎসাশিক্ষার ক্ষেত্রেও সিলেটে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ১৯৬২ সালে যাত্রা শুরু করে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ। পরে ১৯৯৫ সালে জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ এবং ১৯৯৮ সালে নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়।

এরপর সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ ও পার্ক ভিউ মেডিকেল কলেজসহ আরও কয়েকটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ গড়ে ওঠে। ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ। ২০১৯ সালে সুনামগঞ্জেও সরকারি উদ্যোগে মেডিকেল কলেজের কার্যক্রম শুরু হয়।

উচ্চতর চিকিৎসাশিক্ষা ও গবেষণার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। এটি দেশের চতুর্থ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। পাশাপাশি বিভাগটিতে রয়েছে একটি ডেন্টাল কলেজ, ১০টি নার্সিং কলেজ এবং একটি আইএসটি টেকনোলজি ইনস্টিটিউট।

সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. জিয়াউর রহমান চৌধুরী বলেন, চিকিৎসাশিক্ষার বিকাশে সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশের বাইরের শিক্ষার্থীরাও এখানে চিকিৎসাশিক্ষার জন্য আসছেন, যা এ অঞ্চলের জন্য ইতিবাচক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।

সব মিলিয়ে একসময় উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের যে সিলেটের বাইরে ছুটতে হতো, সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিস্তারে সিলেট ধীরে ধীরে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে নিজের অবস্থান শক্ত করছে।