হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা ও নৌযানে হামলার আশঙ্কা থাকলেও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ আবারও বাড়ছে। মার্চেন্ট শিপিং ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে অঞ্চলটি থেকে তেল রপ্তানি সংঘাত শুরুর আগের দৈনিক গড়কেও ছাড়িয়ে গেছে।
কেপলারের হিসাবে, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে কয়েক দিনের হিসাবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৯ দশমিক ৫ থেকে ২২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়েছে। সংঘাত শুরুর আগে এই প্রবাহের দৈনিক গড় ছিল প্রায় ১৮ মিলিয়ন ব্যারেল।
রপ্তানি বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণের কথা বলছেন বিশ্লেষকেরা। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় ট্যাংকার চলাচল, সমুদ্রে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তর এবং হরমুজ প্রণালির বিকল্প পথে সরবরাহ পাঠানোর চেষ্টা।
তবে তেলের দাম প্রত্যাশিত মাত্রায় কমছে না। বিশ্লেষকদের মতে, এর একটি কারণ হতে পারে যুদ্ধের ঝুঁকির কারণে উচ্চ বিমা ব্যয়। একই সঙ্গে বাজারে আবার বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কাও তেলের দামে প্রভাব ফেলছে।
এর মধ্যেই কেপলারের নীতি ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বিভাগের প্রধান মিশেল ব্রোহার্ড একটি ভিন্ন সম্ভাবনার কথা সামনে এনেছেন। তাঁর ধারণা, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ নির্বিঘ্নে চলাচলের সুযোগ পাওয়ার বিনিময়ে কিছু উপসাগরীয় দেশ হয়তো ইরানকে অর্থ দিচ্ছে।
জ্বালানি বিশ্লেষক ররি জনস্টনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ব্রোহার্ড এই ব্যবস্থাকে সম্ভাব্য একটি ‘টোল’ বা মাশুল হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, জাহাজের পণ্য মূল্যের একটি অংশ ইরানকে দেওয়ার মাধ্যমে নিরাপদ চলাচলের সুযোগ তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণিত তথ্য নয়। ব্রোহার্ড নিজেও তাঁর বক্তব্যকে নিশ্চিত অনুসন্ধানের ফল হিসেবে নয়, বরং পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে করা একটি অনুমান হিসেবে তুলে ধরেছেন। স্বাধীনভাবেও এই অর্থ লেনদেনের বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়নি।
এর আগে শিপিংবিষয়ক সাময়িকী লয়েডস লিস্ট দাবি করেছিল, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি একটি কথিত ‘টোল বুথ’ ব্যবস্থা চালু করেছে। তবে এই দাবির বিস্তারিত বাস্তবতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এদিকে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ক্রমেই বাড়ছে। কেপলারের হিসাবে, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে সাত দিনের গড় রপ্তানি সংঘাত শুরুর আগের প্রায় ১৮ মিলিয়ন ব্যারেল দৈনিক পর্যায়ে পৌঁছায়। সংঘাত শুরু হওয়ার পর এটি ছিল অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।
ইরানকে বাদ দিলেও অঞ্চলটির অপরিশোধিত তেল রপ্তানি সেপ্টেম্বর মাসে দৈনিক গড়ে প্রায় ১৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছায় বলে কেপলার জানিয়েছে।
হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতেও বিভিন্ন দেশ বিকল্প পথ ব্যবহার করছে। কেপলারের হিসাবে, প্রায় ৪০ শতাংশ তেল এখন প্রণালিটি এড়িয়ে অন্য পথে পরিবাহিত হচ্ছে। পাশাপাশি সমুদ্রে তেল স্থানান্তর এবং সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাইপলাইন ব্যবহারের মাধ্যমেও সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে।
লোহিত সাগর ব্যবহার করে তেল পরিবহনও এই বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠেছে। তবে জাহাজের স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ রেখে চলাচল করা কোনো কোনো জাহাজ কেপলারের হিসাবের বাইরে থাকতে পারে। ফলে প্রকৃত তেল প্রবাহের পরিমাণ আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানকে গোপনে অর্থ দিয়ে জাহাজ চলাচলের অনুমতি নেওয়া হচ্ছে—এমন ধারণা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলে কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন। তবে এখন পর্যন্ত এর পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
অন্যদিকে ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে—এমন ধারণাও প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে তেলের রপ্তানি বাড়লেও প্রণালিকে ঘিরে সামরিক ঝুঁকি, সম্ভাব্য মাশুল এবং সরবরাহ নিরাপত্তার প্রশ্ন এখনো আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অনিশ্চয়তা হিসেবে রয়ে গেছে।