রবিবার, সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬
২২ ভাদ্র ১৪৩৩

সদ্যপ্রাপ্ত

>> জীবনের সঙ্গী, অক্সফোর্ডেও সহপাঠী

>> ইবিতে শিবির নেতাকে থাপ্পড়ের ঘটনায় তদন্ত কমিটি, বহিরাগত প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা

>> ‘গুপ্ত’ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাব দিলেন জামায়াতের আমির

>> অবশেষে প্রেমিকা রিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক প্রকাশ করলেন সিদ্ধার্থ নিগম

>> বজ্রপাত, দুই পেনাল্টি আর মার্টিনোর মুখোমুখি মেসির ম্যাচ

>> পুতিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে কিয়েভের পথে ট্রাম্পের দুই দূত

>> নজরুলের চেতনা নতুন প্রজন্মে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান

>> সাভারে মাদ্রাসাছাত্রকে ধর্ষণের অভিযোগ, দুই শিক্ষকসহ গ্রেপ্তার ৫

>> বিদ্যুৎমন্ত্রীর বাড়িতে বিদ্যুৎ থাকে, সাধারণ মানুষের বাড়িতে থাকে না: শফিকুর রহমান

>> এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে মরদেহ, মেয়ের বিয়ের টাকা নিয়ে আর ফেরা হলো না ইসমাইলের

আপনি পড়ছেন : জীবনযাত্রা

জীবনের সঙ্গী, অক্সফোর্ডেও সহপাঠী


Rabeya ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ১০:৫৭



জীবনের সঙ্গী, অক্সফোর্ডেও সহপাঠী


স্বপ্ন ছিল উচ্চশিক্ষার, নিজেদের সক্ষমতাকে দেশের গণ্ডির বাইরে যাচাই করার। সেই স্বপ্নের পথেই একসঙ্গে এগিয়েছেন সিনায়াত মাহজাবীন ও আবির হাসান। ২০১৫ সালে তাঁদের বিয়ে হলেও দুজনের একাডেমিক আগ্রহ ও গবেষণার ক্ষেত্র একেবারেই আলাদা। তবু জীবনের সঙ্গী হওয়ার পাশাপাশি তাঁরা হয়ে উঠেছেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী।

সিনায়াত নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেসে পড়াশোনা করেন। অন্যদিকে আবির ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) শিক্ষার্থী। উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে তাঁদের লক্ষ্য ছিল শুধু বিদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া নয়; বরং নতুন পরিবেশে শেখা, গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হওয়া এবং নিজেদের চিন্তার পরিসর আরও বড় করা।

প্রথমে অক্সফোর্ডে পড়ার সুযোগ পান আবির। জননীতি বিষয়ে স্নাতকোত্তরের সুযোগ পাওয়ার পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকে কাজের প্রস্তাবও আসে তাঁর কাছে। পেশাগত অভিজ্ঞতা নেওয়ার সিদ্ধান্তে অক্সফোর্ডে ভর্তি এক বছর পিছিয়ে দেন তিনি। একই সময়ে স্ত্রী সিনায়াতকেও অক্সফোর্ডে আবেদনের জন্য উৎসাহিত করেন।

সিনায়াত অক্সফোর্ডের পাশাপাশি কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়েও আবেদন করেছিলেন। সেখানে ডেনিশ সরকারের বৃত্তিতে পড়ার সুযোগ পেলেও শেষ পর্যন্ত বেছে নেন অক্সফোর্ডকে। কারণ, দুজনেরই ইচ্ছা ছিল একই সময়ে একই শহরে থেকে উচ্চশিক্ষার নতুন অধ্যায় শুরু করার।

সিনায়াতের ভাষায়, তাঁদের অক্সফোর্ডযাত্রা শুধু দুজনের ভর্তি হওয়ার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল একে অপরের স্বপ্নকে সম্মান করা এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পরস্পরের পাশে থাকা।

অক্সফোর্ডে গিয়ে দুজনের ব্যস্ততা ছিল নিজ নিজ পড়াশোনা ও গবেষণা নিয়ে। আবিরের কাজের পরিধি ছিল জননীতি, অর্থনীতি ও উন্নয়নকে ঘিরে। আর সিনায়াতের আগ্রহ ছিল ফার্মাকোলজি ও জীববিজ্ঞানের গবেষণায়। ক্ষেত্র আলাদা হলেও প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা তাঁরা ভাগ করে নিতেন।

কোনো নতুন বিষয় শেখা, গবেষণার জটিলতা, পড়াশোনার চাপ কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সবকিছু নিয়েই চলত তাঁদের আলোচনা। তবে একজন কখনো অন্যজনকে নিজের পথ অনুসরণ করানোর চেষ্টা করেননি। বরং দুজনের আলাদা স্বপ্ন ও পেশাগত পথকে স্বাধীনভাবে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগই দিয়েছেন।

অক্সফোর্ডের পর সিনায়াতের গবেষণার যাত্রা তাঁকে নিয়ে যায় কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। দেশে ফিরে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সময় গবেষণার প্রতি তাঁর আগ্রহ আরও গভীর হয়। পরে ইউসুফ জামিল বৃত্তি নিয়ে ফার্মাকোলজিতে পিএইচডি করেন।

সিনায়াতের গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল কোষের মধ্যে ক্যালসিয়ামনির্ভর সংকেত আদান-প্রদানের প্রক্রিয়া। শরীরের কোষ কীভাবে বিভিন্ন সংকেতের মাধ্যমে নিজেদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে, সেই জটিল প্রক্রিয়ায় ক্যালসিয়ামের ভূমিকা রয়েছে। এই ব্যবস্থার ত্রুটির সঙ্গে বিভিন্ন রোগের সম্পর্কও রয়েছে। ভবিষ্যতে ওষুধ তৈরির গবেষণায় কাজে লাগতে পারে—এমন নতুন অণু শনাক্ত করাই ছিল তাঁর গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য।

অন্যদিকে আবিরের গবেষণার কেন্দ্রে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি। বিশেষ করে রপ্তানি খাতকে কীভাবে আরও বহুমুখী করা যায়, তৈরি পোশাকের মতো সীমিত কয়েকটি খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন শিল্প ও রপ্তানি খাত কীভাবে গড়ে তোলা সম্ভব—এসব প্রশ্ন নিয়ে কাজ করছেন তিনি।

তাঁর গবেষণায় গুরুত্ব পাচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিষয়ও। অর্থাৎ একজন গবেষক যেখানে কোষের ভেতরের জটিল প্রক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করছেন, অন্যজন বিশ্লেষণ করছেন একটি দেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তন কেন সফল হয়, আবার কখনও কেন থেমে যায়।

বিষয় আলাদা হলেও এই ভিন্নতাই তাঁদের আলোচনাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। একজনের গবেষণার জগৎ অন্যজনের কাছে সব সময় সহজবোধ্য না হলেও নিজেদের কাজ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দুজনের চিন্তার পরিসরই বিস্তৃত হয়েছে।

তাঁদের কাছে অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজে পড়াশোনা কেবল ব্যক্তিগত অর্জনের বিষয় নয়। নিজেদের অভিজ্ঞতা দেশের শিক্ষার্থী ও তরুণ গবেষকদের কাজে লাগাতে চান তাঁরা।

তরুণদের প্রতি তাঁদের পরামর্শ—নিজের স্বপ্নকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং তা বাস্তবায়নে ধারাবাহিকভাবে পরিশ্রম করতে হবে। নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ অবশ্যই বড় অর্জন, কিন্তু সাফল্যের আসল শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রত্যাখ্যানের পর আবার চেষ্টা করা, নিজের সীমাবদ্ধতা মেনে নতুন কিছু শেখা এবং অন্যের সঙ্গে নিজের পথের তুলনা না করাই দীর্ঘ পথচলার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

আবির বর্তমানে অক্সফোর্ডের ডিপার্টমেন্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টে পিএইচডি গবেষণায় যুক্ত। আর সিনায়াত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজের পাশাপাশি ক্রনিক কিডনি ডিজিজ নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ব্যবস্থাপনায় যুক্ত রয়েছেন।

দুজনের গবেষণার ক্ষেত্র আলাদা, পথও আলাদা। কিন্তু সেই আলাদা পথের পাশে থেকেও একে অপরের স্বপ্নকে এগিয়ে নেওয়ার গল্পটিই তাঁদের যাত্রাকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।