চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ১৫ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার চুক্তি বাতিলের দাবিতে গণঅনশন ও বিক্ষোভ করেছেন বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।
একই সঙ্গে চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, চুক্তির শর্ত জনসমক্ষে প্রকাশ এবং বন্দর পরিচালনায় দেশীয় সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। দাবি পূরণ না হলে আগামী ১৯ অক্টোবর আবারও অনশন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
সোমবার (১২ অক্টোবর) বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম নগরের কাস্টমস ভবনের বিপরীতে বন্দরের ওয়ান স্টপ সার্ভিস ভবনসংলগ্ন এলাকায় এ কর্মসূচি শুরু হয়। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ, জাতীয়তাবাদী বন্দর রক্ষা কমিটি ও শ্রমিক দলের উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচিতে বিভিন্ন পর্যায়ের শ্রমিক নেতা ও সাধারণ কর্মচারীরা অংশ নেন।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, গত ৮ অক্টোবর বন্দর ব্যবহারকারী ও শ্রমিকদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, জনমত উপেক্ষা করে নেওয়া এ সিদ্ধান্তের ফলে বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
গণঅনশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বলেন, গোপনীয়তা চুক্তির আওতায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। সরকার কী বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং প্রস্তাবিত আধুনিকায়ন কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দিলেই দেশের বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিদ্যমান সমস্যাগুলো কীভাবে সমাধান হবে। তাঁর মতে, আমদানি পণ্যের শুল্কায়ন, পণ্য খালাসে বিলম্ব, বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পেতে জটিলতা এবং বন্দরসংলগ্ন সড়কে যানজটের মতো সমস্যাগুলোরও কার্যকর সমাধান প্রয়োজন।
ইব্রাহিম খোকন বলেন, জাহাজ থেকে কনটেইনার খালাস ও নতুন কনটেইনার বোঝাইয়ের সময়ের সঙ্গে আমদানি পণ্যের শুল্কায়ন ও খালাসের সময়কে এক করে দেখা ঠিক নয়। এক হাজার থেকে তিন হাজার কনটেইনার বহনকারী একটি জাহাজের কনটেইনার খালাস ও নতুন কনটেইনার বোঝাই করে বন্দর ত্যাগ করতে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা লাগতে পারে। তবে আমদানি পণ্য খালাসের সময় শুল্কায়ন ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যক্রমের ওপরও নির্ভর করে।
চট্টগ্রাম বন্দরের জোয়ার-ভাটানির্ভর পরিচালনব্যবস্থার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, শুধু টার্মিনাল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করলেই সরবরাহ ব্যবস্থার সব সীমাবদ্ধতা দূর হবে না। এ জন্য অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা ও সামগ্রিক লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।
গণঅনশনে অংশ নেওয়া শ্রমিক নেতারা অভিযোগ করেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে এনসিটি ইজারা দেওয়া হলে বন্দরে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের কাজের ধরন ও চাকরির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে স্পষ্ট নিশ্চয়তা নেই। তাঁদের দাবি, শ্রমিকদের জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
বক্তারা আরও বলেন, দেশের প্রধান বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরের দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা চুক্তির সঙ্গে অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলোও জড়িত। বন্দরের আধুনিকায়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেও তাঁরা চুক্তির শর্ত, সম্ভাব্য সুফল এবং কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের দাবি জানান।
আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি, এনসিটি ইজারা দেওয়ার চুক্তি বাতিল করে দেশীয় দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বন্দরের কার্যক্রম পরিচালনা করা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের উদ্যোগের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য হিসেবে বন্দরের সক্ষমতা ও পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের টার্মিনাল পরিচালনার পাশাপাশি যন্ত্রপাতি ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোয় বিনিয়োগের বিষয় রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে চুক্তির স্বচ্ছতা, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে চুক্তির বিস্তারিত শর্ত প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে বিরোধ নিষ্পত্তির দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।