চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ইয়ার্ডে গ্যাস নিঃসরণে ১০ শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনায় ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের বেশ কিছু গাফিলতি চিহ্নিত করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি। তবে জাহাজটি ভাঙার উপযোগী ও নিরাপদ কি না, তা যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা সরকারি সংস্থাগুলোর কোনো গাফিলতি প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। এ নিয়ে তদন্তের নিরপেক্ষতা ও পূর্ণাঙ্গতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ১৪ আগস্ট দুর্ঘটনার পর শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ কে এম বেনজামিন রিয়াজীকে প্রধান করে ১১ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পাঁচ দিনের তদন্ত শেষে সোমবার মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত অনুযায়ী, দুর্ঘটনাটি ঘটে জাহাজটির ৩ নম্বর ব্যালাস্ট ওয়াটার ট্যাংকে। জাহাজের ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এসব ট্যাংকে পানি রাখা হয়। সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী, জাহাজের বিভিন্ন ট্যাংক পরীক্ষা করে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের ‘সেফ ফর ম্যান এন্ট্রি’ এবং ‘গ্যাস ফ্রি ফর হট ওয়ার্ক’ সনদ দেওয়ার বিধান রয়েছে।
তবে অভিযোগ উঠেছে, ব্যালাস্ট ওয়াটার ট্যাংক পরীক্ষা না করেই জাহাজটি কাটার জন্য প্রয়োজনীয় দুই ধরনের সনদ দেওয়া হয়েছিল। ২০২৫ সালের ১১ জুলাই বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক এস এম সাখাওয়াত হোসেন জাহাজটি পরিদর্শন করেছিলেন। বর্তমানে তিনি রাজশাহী জেলায় কর্মরত।
সাখাওয়াত হোসেনের ভাষ্য, কোনো ট্যাংক খালি থাকলে সেটি পরীক্ষা করা সম্ভব হলেও তরল পদার্থে পূর্ণ ট্যাংক পরীক্ষা করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের অবহেলার কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে একই বিধিমালার আওতায় থাকা বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের দায়িত্ব পালনে কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা প্রতিবেদনে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়নি।
শিপ রিসাইক্লিং বিধিমালা অনুযায়ী, জাহাজ আমদানির অনুমোদন থেকে শুরু করে জাহাজটি ক্ষতিকর ও বিষাক্ত বর্জ্যমুক্ত কি না এবং ইয়ার্ডে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের দায়িত্ব রয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে ইয়ার্ড মালিকের ছয়টি গাফিলতির কথা বলা হয়েছে। দুর্ঘটনার সময় জাহাজের ট্যাংক কাটার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের গ্যাস মাস্ক ছিল না। ঝুঁকিপূর্ণ কাজ চললেও ইয়ার্ডে সেফটি ম্যানেজার, অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসক কিংবা জরুরি উদ্ধারকারী দল ছিল না।
এ ছাড়া ইয়ার্ডে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সরঞ্জাম মজুত থাকার পরও উচ্চঝুঁকির কাজে সেগুলো ব্যবহার করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দুর্ঘটনার পর পরিবেশ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসকেও যথাসময়ে খবর দেওয়া হয়নি।
নিহত শ্রমিকদের নিয়েও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। জাহাজ আমদানির সময় শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের অনুমোদিত প্রশিক্ষিত শ্রমিকদের তালিকা থাকার কথা। কিন্তু দুর্ঘটনার দিন নিহত পাঁচ শ্রমিকের মধ্যে মাত্র একজন ওই তালিকায় অনুমোদিত ছিলেন।
অন্যদিকে, জাহাজ আমদানি, বহির্নোঙরে পরিদর্শন, সৈকতায়ন ও ভাঙার অনুমোদনসংক্রান্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে মত দেওয়া হয়েছে। সেখানে বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির প্রধান এ কে এম বেনজামিন রিয়াজীর কাছে সরকারি সংস্থাগুলোর দায় না থাকার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি প্রতিবেদনে তা দেখার কথা বলেন। তবে নির্দিষ্ট পৃষ্ঠা বা পয়েন্ট জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদন দেখে পরে যোগাযোগ করতে বলেন।
পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান মনে করেন, যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া জাহাজ কাটার অনুমোদন ও সনদ দেওয়া হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ও দপ্তরগুলোকেও জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, এসব মৃত্যু স্বাভাবিক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ইয়ার্ড মালিকের পাশাপাশি অনুমোদন ও তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের দায়ও নির্ধারণ করা জরুরি। তা না হলে তদন্ত প্রতিবেদন শুধু একটি আনুষ্ঠানিক নথিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।