নোয়াখালী আঞ্চলিক পাসপোর্ট কার্যালয়ে সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং দালালদের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও জন্মনিবন্ধনের তথ্য সংশোধনের মাধ্যমে পাসপোর্ট পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের সঙ্গে কার্যালয়ের উপপরিচালক (ডিডি) মেহেদী হাসান ও উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) মো. নাজমুল আহসান হাবিবের নাম উঠে এসেছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগ অনুযায়ী, নোয়াখালীসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলার কিছু ব্যক্তি, যাঁদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি বা মাদকসংক্রান্ত মামলা রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তাঁরা আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য সংশোধন করে পাসপোর্টের আবেদন জমা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনগত যোগ্যতা, তথ্যের সত্যতা এবং আবেদন যাচাইয়ের প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, সরাসরি কাউন্টারে আবেদন জমা দিতে গেলে বিভিন্ন ভুলত্রুটি দেখিয়ে তাঁদের একাধিকবার ফেরত পাঠানো হয়। অন্যদিকে, দালালের মাধ্যমে ২ হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার চুক্তি করলে আবেদন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া তুলনামূলক সহজ হয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নির্দিষ্ট কর্মকর্তা বা প্রশাসনিক পরিচয়ের নাম উল্লেখ করেও কিছু আবেদন দ্রুত জমা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে এ ধরনের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট নথি, লেনদেনের প্রমাণ এবং দাপ্তরিক রেকর্ড যাচাই করা জরুরি।
পাসপোর্ট কার্যালয়ের সামনের সড়কের বিভিন্ন কম্পিউটার, ফটোকপি ও স্টুডিও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সোনাইমুড়ী, মাইজদী, বেগমগঞ্জ ও চাটখিল এলাকার কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দালালচক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে।
সোনাইমুড়ীর বদরুদ্দোজা মার্কেটের সুফিয়া এন্টারপ্রাইজসহ কয়েকটি দোকানের নামও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, পাসপোর্ট-সংক্রান্ত তথ্য ও পরামর্শ দেওয়ার আড়ালে এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনোটি অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত। তবে প্রতিষ্ঠানগুলোর সংশ্লিষ্টতা ও অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগে কয়েকজন সেবাপ্রার্থীর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। তাঁদের পরিচয় ও বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই এবং অর্থ লেনদেনের প্রমাণ সংগ্রহ করা গেলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরূপণ সহজ হবে।
বিশেষ দাপ্তরিক সূত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর ও ফেনীসহ বিভিন্ন জেলার কার্যালয়ে আগে ফেরত দেওয়া কিছু আবেদন নোয়াখালীতে এসে এনআইডি সংশোধনসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জমা নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, উপপরিচালক মেহেদী হাসানের অদৃশ্য যোগসাজশ এবং উপসহকারী পরিচালক মো. নাজমুল আহসান হাবিবের মধ্যস্থতায় প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০টি বিতর্কিত আবেদন জমা নেওয়া হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, কার্যালয়ে জমা হওয়া আবেদনের একটি বড় অংশ দালালদের মাধ্যমে আসে। এমনকি কাউন্টারে ‘হাবিব স্যার’ বা ‘নাজমুল স্যার’-এর নাম উল্লেখ করলে কিছু জটিল আবেদন দ্রুত জমা নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে প্রতিদিনের আবেদনের সংখ্যা, দালালদের মাধ্যমে আসা আবেদনের অনুপাত এবং কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিশ্চিত করতে আবেদন রেজিস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ ও সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
পাসপোর্টের আবেদনে মিথ্যা তথ্য প্রদান, জাল পরিচয়পত্র ব্যবহার, পরিচয়সংক্রান্ত নথিতে জালিয়াতি কিংবা প্রাসঙ্গিক তথ্য গোপন করার অভিযোগ গুরুতর। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একইভাবে, কোনো আবেদনকারীর বিরুদ্ধে মামলা থাকলেই তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাসপোর্ট পাওয়ার অযোগ্য হয়ে যান—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে প্রযোজ্য আইন, মামলার অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিধান যাচাই করা জরুরি।
সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, অনিয়মে সহায়তা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তাই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ।
উত্থাপিত অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে উপসহকারী পরিচালক মো. নাজমুল আহসান হাবিব তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “আমার বা অফিসের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ সত্য নয়। আমি এখানে জুনিয়র অফিসার, আমার ওপরে উপপরিচালক মেহেদী হাসান স্যার আছেন। তিনি যেভাবে নির্দেশ দেন, আমরা সেভাবেই কাজ পরিচালনা করি।”
অন্যদিকে, নোয়াখালী আঞ্চলিক পাসপোর্ট কার্যালয়ের সদ্য যোগদানকৃত উপপরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, “আমি এ কার্যালয়ে নতুন যোগ দিয়েছি। উপস্থাপিত অনিয়মের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হচ্ছে এবং আমি দ্রুত তদন্তপূর্বক আইনগত ও দাপ্তরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
পাসপোর্ট সেবা নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরূপণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। অভিযোগের ভিত্তিতে আবেদন গ্রহণ ও বাতিলের নথি পরীক্ষা, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা, সেবাপ্রার্থীদের বক্তব্য গ্রহণ এবং অর্থ লেনদেনের তথ্য যাচাই করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে সরকারি ফি ও সেবার নির্ধারিত সময়সীমা দৃশ্যমান স্থানে প্রকাশ, আবেদন গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং দালালদের মাধ্যমে অবৈধ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
পাসপোর্ট সেবায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা শুধু নাগরিক হয়রানি কমানোর জন্য নয়, পরিচয় যাচাই ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। তাই অভিযোগগুলো দ্রুত, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা জরুরি।
বিস্তারিত আসছে দ্বিতীয় পর্বে...