বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৫, ২০২৬
২১ কার্তিক ১৪৩৩

সদ্যপ্রাপ্ত

>> কুর্মিটোলায় পুলিশের টহল গাড়ি লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ, আহত কনস্টেবল

>> শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে সহিংসতা, সরকারকে চাপে ফেলার অভিযোগ

>> কর্মস্থলে ফিরেছেন পোশাকশ্রমিকেরা, শিল্পাঞ্চলে মোতায়েন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

>> এক দিনের সফরে মোংলায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, খুলনায়ও রয়েছে কর্মসূচি

>> গাজীপুরের মোড়ে মোড়ে বিজিবি ও ব্যাটালিয়ন আনসার মোতায়েন

>> নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ‘গুপ্ত’ সাদিক কায়েম ‘জয় বাংলা’ বলে মিছিল করেছেন: রাশেদ খাঁন

>> অব্যবস্থাপনার কারণে সরকারকে অনেকে ‘লন্ডনিগো সরকার’ বলছে: মঞ্জু

>> শ্রমিকের গায়েবানা জানাজায় সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ, ছত্রভঙ্গ এনসিপির নেতাকর্মীরা

>> সাভার-আশুলিয়ায় শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, সাংবাদিক-পুলিশসহ আহত অন্তত ১০

>> গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে যেভাবে প্রাণ হারান তৌফিক

আপনি পড়ছেন : গাজীপুর

শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে সহিংসতা, সরকারকে চাপে ফেলার অভিযোগ


Sifat Islam Sohag ৫ নভেম্বর ২০২৬, সকাল ১১:৪১



শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে সহিংসতা, সরকারকে চাপে ফেলার অভিযোগ


পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণে সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। বুধবার বোর্ডের প্রথম সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। আগামী ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কার্যকরের ঘোষণা দেওয়া হলেও বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক বিক্ষোভ ও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। এসব কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কারখানা, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা ও যানবাহনে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার দাবি, চলমান আন্দোলনে শ্রমিকদের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের লোকজনও যুক্ত হয়েছেন। তাদের অভিযোগ, অর্থ ও লোকবল দিয়ে সাধারণ শ্রমিকদের উসকে দিয়ে সড়কে নামানো হচ্ছে। এমনকি শ্রমিকের পরিচয় ব্যবহার করেও কিছু ব্যক্তি সহিংস কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

শিল্পাঞ্চল পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি গাজী জসীম উদ্দীন বুধবার সন্ধ্যায় কালবেলাকে বলেন, নতুন মজুরি নির্ধারণে বোর্ড গঠন করা হয়েছে এবং প্রথম সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কার্যকর করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এরপরও যারা আন্দোলনের নামে সহিংসতা চালাচ্ছেন, তাদের কাছে শ্রমিকদের স্বার্থ মুখ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার দাবি, এ আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে সরকারকে চাপে ফেলার চেষ্টা চলছে।

মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বুধবারও সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে শ্রমিক বিক্ষোভ হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। তবে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকায় মিরপুরে শ্রমিকদের বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের সুযোগ হয়নি।

অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনে মিরপুরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে

গত কয়েক দিনের ধারাবাহিক বিক্ষোভ ও সহিংসতায় মিরপুর এলাকার বাসিন্দাদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। তবে বুধবার পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি দেখা যায়। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকায় শ্রমিকরা বিক্ষোভে নামতে পারেননি। বেশ কয়েকটি কারখানায় শ্রমিকেরা কাজে ফিরেছেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত ক্রাইম অ্যান্ড প্রিভেনশন উত্তর) মো. মহিদুল ইসলাম জানান, মিরপুর-১, পল্লবী, রূপনগর, মিরপুর-১২ ও কাফরুলসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

হেমায়েতপুরে সংঘর্ষ, ওসির গাড়িতে আগুন

শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বুধবার সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সকালে হেমায়েতপুরের পদ্মার মোড়ে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। সংঘর্ষে সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলম, ঢাকা জেলা উত্তরের ওসি সাইদুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন আহত হন।

ঘটনাস্থলে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীও হামলা ও মারধরের শিকার হন। এদিকে আন্দোলনে উসকানি দেওয়া এবং ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে সহায়তার অভিযোগে তিন শ্রমিক নেতাকে আটক করেছে পুলিশ।

ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন বলেন, বুধবার সকালে পদ্মার মোড়ে দুই দিক থেকে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার শ্রমিক জড়ো হয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালান। এ সময় আন্দোলনকারীরা সাভার মডেল থানার ওসির গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন। হামলায় ওসি গুরুতর আহত হন বলে জানান তিনি।

আন্দোলনের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা

শ্রমিক আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহের সময় হামলার শিকার হয়েছেন কয়েকজন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কালবেলার সাভার প্রতিনিধি মো. হুমায়ুন কবিরের সহযোগী আনাস বিন তাহের, স্টার নিউজের জেলা প্রতিনিধি আহমাদ সোহান সিরাজী, একাত্তর টিভির সাভার প্রতিনিধি রাইয়ান বিন আমিন ও তাঁর সহযোগী উজ্জ্বল হোসেন।

এ ছাড়া নিউজ ২৪ টিভির সাভার প্রতিনিধি নাজমুল হুদা ও তাঁর সহযোগী ইমদাদুল হক, যমুনা টিভির ভিজে কাজী শহীদুল্লাহ তনয়, দৈনিক দেশের কথার সাভার প্রতিনিধি কাউসার আহমেদ, একুশে বাংলার ঢাকা জেলা উত্তরের প্রতিনিধি হাফিজুর রহমান এবং বাংলা টিভি ডিজিটালের আশুলিয়া প্রতিনিধি শফি সুমনসহ আরও কয়েকজন হামলার শিকার হয়েছেন।

গাজীপুরে সংঘর্ষ, থানায় হামলার চেষ্টা

গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে টানা ষষ্ঠ দিনের শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে বুধবার দিনভর উত্তেজনা ছিল। সকালে গাছা ও বড়বাড়ী এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকেরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাঁদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ বাসন থানায় হামলার চেষ্টা করে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষের কারণে মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গাছা এলাকায় দুই থেকে চার হাজার শ্রমিক সড়কে নামেন। পরে পুলিশ তাঁদের সরিয়ে দেয়। জয়দেবপুরেও শ্রমিকদের অবস্থান সরিয়ে দেওয়া হয়। সালনা, রাজেন্দ্রপুর, শফিপুর ও পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। তবে কাশিমপুরে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে ছিল।

এদিকে দুপুর পৌনে ১টার দিকে চান্দনা চৌরাস্তায় আন্দোলনে নিহত পোশাকশ্রমিক তৌফিক হোসেনের গায়েবানা জানাজার আয়োজন করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও জাতীয় শ্রমিক শক্তি। আয়োজকদের অভিযোগ, জানাজার প্রস্তুতির সময় পুলিশ ও বিজিবি সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে উপস্থিত লোকজনকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে জানাজা অনুষ্ঠিত হতে পারেনি।

এনসিপির কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক আলী নাছের খান অভিযোগ করেন, শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, এ ঘটনায় এনসিপি ও সহযোগী সংগঠনের ২০ জনের বেশি নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। তিনি তৌফিক হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার এবং শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান।

শ্রমিক অসন্তোষ মোকাবিলায় গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করেছে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিজিবি, আনসার ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) মোট ২৫ প্লাটুন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে বিজিবির ১২, আনসারের পাঁচ এবং এসআরবির আট প্লাটুন রয়েছে। এর আগে সেখানে বিজিবির ১১ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন ছিল।

অন্যদিকে, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সভাপতি মো. শওকত হোসেন সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে কাশিমপুর, কোনাবাড়ী, ভোগড়া বাইপাস ও চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় অবস্থান নেন। এ সময় তিনি সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান।

দুপুরের পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে। বিক্ষিপ্ত কিছু আন্দোলন ছাড়া শিল্পাঞ্চল ও মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

নারায়ণগঞ্জে ১ হাজার ৫০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ৮

টানা দুই দিন সড়ক অবরোধের পর বুধবার তৃতীয় দিনেও নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় সড়ক অবরোধের চেষ্টা করেন পোশাকশ্রমিকেরা। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শুরুতেই তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। সকাল ৯টার দিকে শিবু মার্কেট ও কাঠেরপুল এলাকায় পুলিশ টিয়ার গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।

শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনায় ২১ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও দেড় হাজার ব্যক্তিকে আসামি করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

পুলিশ জানায়, বুধবার সকালে শিবু মার্কেট ও কাঠেরপুল এলাকার পাঁচটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিকেরা কাজে যোগ দিতে কারখানায় আসেন। পরে তাঁদের একাংশ কাজ ছেড়ে সড়কে নেমে অবরোধের চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে কাঠেরপুল এলাকার মেট্রো গার্মেন্টসের শ্রমিকেরা সড়কে নামলে পুলিশ টিয়ার গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ফলে সড়কে অবরোধ গড়ে তুলতে পারেননি শ্রমিকেরা।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ অঞ্চল-৪-এর পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ মাহমুদ বলেন, নারায়ণগঞ্জের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত সহিংসতা থেকে দূরে থাকে। কিছু দুষ্কৃতকারী সহিংসতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে শুরুতেই কঠোর অবস্থান নিয়ে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করা হয়।

নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী জানান, সহিংসতার ঘটনায় আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া এজাহারে ২১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১ হাজার ৫০০ জনকে আসামি করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হয়েছে।