দেশের অভিনয়শিল্পীদের ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে। কখনো জীবিত শিল্পীর মৃত্যুর খবর, কখনো অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার দাবি, আবার কখনো নাটক বা সিনেমার দৃশ্যকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। এসব গুজবের কারণে বিব্রত হওয়ার পাশাপাশি মানসিক চাপেও পড়ছেন অনেক অভিনয়শিল্পী।
অভিনয়শিল্পী ও চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতাদের মতে, এসব ঘটনার মাধ্যমে শুধু ব্যক্তিগতভাবে শিল্পীদের ক্ষতি হচ্ছে না, সামগ্রিকভাবে শিল্পীসমাজের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সম্প্রতি চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের মৃত্যুর খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। গত ২৬ আগস্ট ছড়ানো ওই দাবিটি পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। অসুস্থতার চিকিৎসায় বর্তমানে লন্ডনে থাকা এই অভিনেতাকে নিয়েই ভুয়া মৃত্যুসংবাদ ছড়ানো হয়।
এ ধরনের সংবেদনশীল খবর প্রকাশের আগে পরিবারের সদস্য বা নির্ভরযোগ্য সূত্রের কাছ থেকে তথ্য নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, জীবিত কোনো ব্যক্তিকে মৃত দাবি করে প্রচার করলে তাঁর পরিবার, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক তৈরি হয়।
এর আগে অভিনেতা হাসান মাসুদকে নিয়েও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়েছিল, তিনি অভিনয় ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি ধর্মীয় জীবন বেছে নিচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে তাঁর সহকর্মীদের মধ্যেও আলোচনা তৈরি হয়।
পরে হাসান মাসুদ জানান, তিনি অভিনয় পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেননি। তাঁর বক্তব্য ছিল, ভালো চরিত্র পেলে তিনি অভিনয় করবেন। নিজের পেশা সম্পর্কে দেওয়া মন্তব্যকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করায় তিনি বিব্রত হন।
চিত্রনায়িকা পপিকেও ঘিরে ছড়ানো হয় ভুয়া বক্তব্য। তাঁর ছবি ব্যবহার করে একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, অভিনয়কে পাপ মনে করে তিনি চলচ্চিত্র থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। পোস্টটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হলেও পরে জানা যায়, ওই বক্তব্য পপির নয়।
পপি বরং চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে নিজের দীর্ঘ সম্পর্কের কথা তুলে ধরে বলেন, এই অঙ্গন তাঁর কাছে পরিবারের মতো এবং এখানে কাজ করা মানুষদের উপার্জনকে তিনি সম্মানের চোখে দেখেন।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল অভিনেতা মামুনুর রশীদের একটি ছবি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুইমিংপুলে এক তরুণীর সঙ্গে তাঁর ছবি প্রকাশ করে নানা ধরনের শিরোনাম দেওয়া হয়। অনেকেই ধরে নেন, এটি অভিনেতার বাস্তব জীবনের কোনো ঘটনা।
কিন্তু পরে জানা যায়, ছবিটি ছিল ‘আমরা ভাইরাল’ নামের একটি ধারাবাহিক নাটকের দৃশ্য। বিষয়টি নিয়ে বিব্রত হন মামুনুর রশীদ। তাঁর মতে, কোনো ঘটনার সত্যতা যাচাই না করেই সেটিকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অযথা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন।
মামুনুর রশীদের ঘটনায় বিতর্ক থামার আগেই আরেক বরেণ্য অভিনেত্রী দিলারা জামানকে নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে বাড়ি দখলের খবর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু অনলাইন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ভাড়াটিয়া তাঁর বাড়ি দখল করে নিয়েছে এবং তিনি বর্তমানে ভাড়া বাসায় থাকছেন।
পরে দিলারা জামান জানান, এ খবরের সঙ্গে তাঁর বাস্তব জীবনের কোনো মিল নেই। বিষয়টি শুনে তিনি বিস্ময় ও বিরক্তি প্রকাশ করেন এবং তথ্য প্রকাশের আগে কিছুটা যাচাই-বাছাই করার আহ্বান জানান।
এদিকে শুধু ভুয়া সংবাদ নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেও শিল্পীদের ছবি ও পরিচয় নিয়ে অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। অভিনয়শিল্পী সংঘের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ মামুন অপু জানান, অভিনেতা এজাজের ছবি ব্যবহার করে একটি হারবাল পণ্যের বিজ্ঞাপন তৈরি করা হয়েছিল। এতে সংশ্লিষ্ট শিল্পী বিব্রত হওয়ার পাশাপাশি তাঁর ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাশেদ মামুন অপুর ভাষ্য, এমন ঘটনা এখন নিয়মিত ঘটছে এবং শিল্পীদের নানা উপায়ে হেনস্তা করা হচ্ছে। তাঁর মতে, যাচাইহীন তথ্যের পাশাপাশি এআই প্রযুক্তির অপব্যবহারও নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয় চৌধুরীও ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, কোনো শিল্পীকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ালে সংশ্লিষ্ট সংগঠনকে দ্রুত জানানো উচিত, যাতে প্রয়োজন হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
শিল্পীদের বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য দেখেই তা সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে মৃত্যু, অসুস্থতা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা পেশা ছাড়ার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে তথ্য যাচাই ছাড়া প্রচার করলে তার প্রভাব সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যক্তিজীবন ও পেশাগত পরিচয়ের ওপর পড়তে পারে।
শিল্পী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে তাই গুজব বন্ধে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভুয়া তথ্য ও কৃত্রিমভাবে তৈরি কনটেন্টের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।