১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ঘটে যায় এমন এক মর্মান্তিক ঘটনা, যা মুহূর্তেই পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ব্রিটিশ রাজপরিবারের বহুল আলোচিত সদস্য প্রিন্সেস ডায়ানা।
মাত্র ৩৬ বছর বয়সে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষকে শোকাহত করে। প্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেলেও ডায়ানার জীবন ও মৃত্যুকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ এখনো কমেনি।
১৯৯৭ সালের ৩০ আগস্ট ইতালির সার্ডিনিয়া থেকে ডায়ানা ও দোদি আল-ফায়েদ ব্যক্তিগত বিমানে প্যারিসে পৌঁছান। বিমানবন্দরে নামার পর থেকেই পাপারাজ্জিদের নজরে ছিলেন তাঁরা।
প্রথমে তাঁরা আল-ফায়েদের ভিলা উইন্ডসরে যান। পরে বিকেলে রিটজ হোটেলে ফিরে ইম্পেরিয়াল স্যুটে অবস্থান নেন। রাতে বাইরে নৈশভোজে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও পাপারাজ্জিদের উপস্থিতির কারণে শেষ পর্যন্ত হোটেলেই খাবার খান তাঁরা।
রাত পেরিয়ে ৩১ আগস্টের প্রথম প্রহরে ডায়ানা ও দোদি হোটেলের পেছনের পথ দিয়ে একটি কালো মার্সিডিজ গাড়িতে বের হন। গাড়িটি চালাচ্ছিলেন রিটজ হোটেলের নিরাপত্তা বিভাগের উপপ্রধান অঁরি পল। সামনের আসনে ছিলেন দোদির দেহরক্ষী ট্রেভর রিস-জোন্স।
হোটেল থেকে বের হওয়ার পরও পাপারাজ্জিরা গাড়িটির পিছু নিতে থাকেন। তাদের এড়িয়ে দ্রুতগতিতে চলার সময় চালক গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।
হোটেল ছাড়ার আনুমানিক তিন মিনিট পর প্যারিসের পঁ দ্য ল’আলমা আন্ডারপাসে গাড়িটি একটি কংক্রিটের পিলারে সজোরে ধাক্কা খায়। মুহূর্তেই গাড়িটি দুমড়েমুচড়ে যায়।
দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান চালক অঁরি পল ও দোদি আল-ফায়েদ। গুরুতর আহত হন ডায়ানা ও তাঁর দেহরক্ষী ট্রেভর রিস-জোন্স।
দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে পৌঁছান ফরাসি উদ্ধারকর্মীরা। তাঁদের একজন জাভিয়ের গুরমেলোঁ গাড়ির কাছে গিয়ে ডায়ানাকে জীবিত অবস্থায় দেখতে পান।
উদ্ধারকারীদের বর্ণনা অনুযায়ী, তখনো ডায়ানা নড়াচড়া করতে পারছিলেন এবং কথা বলছিলেন। তাঁকে গাড়ি থেকে বের করার সময় তাঁর হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই তাঁকে সিপিআর দেওয়া হয় এবং হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্রম ফিরে আসে।
পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে ডায়ানা ও ট্রেভরকে প্যারিসের পিতিয়ে-সালপেত্রিয়ের হাসপাতালে নেওয়া হয়।
হাসপাতালে পৌঁছানোর পর ডায়ানার জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয়। কিন্তু তাঁর আঘাত ছিল অত্যন্ত গুরুতর। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সময় ভোরের দিকে প্রিন্সেস ডায়ানাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
এরপর তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই বিশ্বজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। ‘জনতার রাজকুমারী’ হিসেবে পরিচিত ডায়ানার আকস্মিক মৃত্যু লাখো মানুষের মনে গভীর দাগ কাটে।
ডায়ানার মৃত্যুর পর থেকেই দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও জল্পনা তৈরি হয়। বিশেষ করে গাড়ির গতি, চালকের অবস্থা এবং পাপারাজ্জিদের ধাওয়া—সবকিছু নিয়েই আলোচনা শুরু হয়।
ফরাসি বিচারিক তদন্তে পরে বলা হয়, দুর্ঘটনাটি পরিকল্পিত কোনো হত্যাকাণ্ডের ফল নয়। তদন্তে গাড়িচালক অঁরি পলের মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং অতিরিক্ত গতিকে দুর্ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যেও আনুষ্ঠানিক তদন্ত হয়। ২০০৮ সালের রায়ে জুরি সিদ্ধান্ত দেয়, চালকের চরম অবহেলা এবং ডায়ানা ও দোদির পিছু নেওয়া পাপারাজ্জিদের বেপরোয়া আচরণ তাঁদের মৃত্যুর পেছনে ভূমিকা রেখেছিল।
ডায়ানার জীবন ছিল রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব, জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড ও মানবিক কাজের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। গৃহহীন, শিশু, প্রতিবন্ধী এবং এইচআইভি/এইডসে আক্রান্ত মানুষের জন্য কাজ করে তিনি বিশ্বজুড়ে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছিলেন।
১৯৯৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় তাঁর শেষকৃত্য। বিপুলসংখ্যক মানুষ রাস্তায় নেমে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। বিশ্বের বহু দেশে অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
তাঁকে পরে নর্থ্যাম্পটনশায়ারে স্পেন্সার পরিবারের এস্টেট অলথ্রপে সমাহিত করা হয়।
ডায়ানার মৃত্যুর পর বহু বছর পেরিয়ে গেলেও সেই দুর্ঘটনার রাত, তাঁর মানবিক কর্মকাণ্ড এবং ব্যক্তিত্ব নিয়ে মানুষের আগ্রহ এখনো রয়েছে। আনুষ্ঠানিক তদন্তে দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত এলেও তাঁকে ঘিরে নানা প্রশ্ন ও ষড়যন্ত্রতত্ত্বের আলোচনা পুরোপুরি থামেনি।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, সিএনএন, ওয়াশিংটন পোস্ট, পিপল, রয়্যাল ডট ইউকে ও বায়োগ্রাফি ডটকম।