দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রেক্ষাগৃহে এসেছে যশ অভিনীত বহুল আলোচিত সিনেমা ‘টক্সিক’। ছবিটি বক্স অফিসে ভালো সাড়া পেলেও দর্শক ও চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের প্রতিক্রিয়া একেবারে একমুখী নয়। সিনেমার গল্প, চরিত্র নির্মাণ, অতিরিক্ত অ্যাকশন, অভিনয় এবং সম্পাদনাসহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে।
গীতু মোহনদাস পরিচালিত এই সিনেমায় যশের সঙ্গে অভিনয় করেছেন কিয়ারা আদভানি, হুমা কুরেশি, তারা সুতারিয়া, রুক্মিণী বসন্ত ও নয়নতারা। মুক্তির আগে প্রচারণায় নারী অভিনয়শিল্পীদের উপস্থিতি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। ফলে তাঁদের চরিত্রগুলো গল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে—এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সিনেমাটি দেখার পর সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।
১. বড় আয়োজন, কিন্তু গল্পে অসামঞ্জস্য
‘টক্সিক’-এ বড় বাজেটের অ্যাকশন সিনেমার বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক ধাঁচের ভিজ্যুয়াল, অপরাধজগত, সম্পর্ক, আবেগ ও অ্যাকশন—বিভিন্ন উপাদান একসঙ্গে রাখা হয়েছে। তবে এতগুলো বিষয় একসঙ্গে উপস্থাপন করতে গিয়ে গল্পের ধারাবাহিকতা কিছু জায়গায় দুর্বল হয়েছে বলে মনে করছেন দর্শকদের একাংশ।
কিছু সংলাপ ও দৃশ্যও প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সাজানো মনে হয়েছে। ফলে সিনেমার নিজস্ব গল্পের চেয়ে এর বাহ্যিক আয়োজন অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে।
২. নারী চরিত্রের সংখ্যা বেশি, কিন্তু স্বতন্ত্রতা কম
ছবিতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্র থাকলেও তাঁদের ব্যক্তিগত গল্প বা চরিত্রের গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, অধিকাংশ নারী চরিত্রের কাহিনি শেষ পর্যন্ত যশের চরিত্রকে কেন্দ্র করেই এগিয়েছে।
ফলে তাঁদের নিজস্ব ইচ্ছা, দ্বন্দ্ব কিংবা সিদ্ধান্তের জায়গা তুলনামূলকভাবে সীমিত থেকেছে। বিশেষ করে নারী নির্মাতার পরিচালিত সিনেমা হিসেবে এখানে আরও শক্তিশালী নারী চরিত্রের প্রত্যাশা করেছিলেন অনেকে।
৩. নারীবাদী বক্তব্য কতটা কার্যকর?
মুক্তির আগে সিনেমাটিকে ঘিরে নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কথাও আলোচনায় এসেছিল। কিন্তু মুক্তির পর সেই অবস্থান নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ।
সমালোচকদের একটি অংশের মতে, নারী চরিত্রগুলোকে শক্তিশালী ও স্বাধীন হিসেবে দেখানোর চেষ্টা থাকলেও তাঁদের আবেগ ও জীবন অনেক ক্ষেত্রেই প্রধান পুরুষ চরিত্রটির সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিছু দৃশ্যে চরিত্রের ব্যক্তিত্বের চেয়ে বাহ্যিক আকর্ষণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
৪. যশের তারকাসুলভ উপস্থিতিই কি বেশি প্রাধান্য পেয়েছে?
‘টক্সিক’-এর মূল আকর্ষণ যে যশ, সেটি শুরু থেকেই পরিষ্কার। তাঁর স্টাইল, সংলাপ বলার ধরন, চলাফেরা এবং পর্দায় উপস্থিতিকে বড় করে দেখানো হয়েছে।
গল্পের পরবর্তী অংশে চরিত্রটির তরুণ বয়সও দেখানো হয়। দুই সময়ের চরিত্রে পার্থক্য আনতে যশ অভিনয় ও শারীরিক ভঙ্গিতে পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন। তবে কিছু দৃশ্যে অভিনয় অতিরিক্ত নাটকীয় হয়ে গেছে বলে মনে করেছেন সমালোচকদের একাংশ। তাঁদের মতে, চরিত্রের আবেগের চেয়ে যশের ‘স্টার ইমেজ’ অনেক সময় সামনে চলে এসেছে।
৫. অ্যাকশন বেশি, আবেগ কম
সিনেমাটিতে অ্যাকশন দৃশ্যের আধিক্য অন্যতম আলোচিত বিষয়। সংঘর্ষ, গোলাগুলি ও সহিংসতার নানা দৃশ্য গল্পের বড় অংশজুড়ে রয়েছে।
অন্যদিকে বাবা-ছেলের সম্পর্ক, ভাই-বোনের বন্ধন, ভালোবাসা, বিশ্বাসঘাতকতা এবং অপরাধজগতের মতো আবেগঘন বিষয়ও গল্পে রয়েছে। কিন্তু অ্যাকশনের ঘনঘটার কারণে এসব সম্পর্কের আবেগ দর্শকের কাছে গভীরভাবে পৌঁছানোর সুযোগ কমেছে বলে মনে করছেন অনেকে।
৬. ভিজ্যুয়াল চমৎকার, সম্পাদনায় সমস্যা
সিনেমাটির দৃশ্যায়ন ও গ্রাফিকসকে এর অন্যতম শক্তিশালী দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। বড় পর্দায় বেশ কিছু দৃশ্য দর্শকদের চোখে আলাদা ছাপ ফেলতে পারে।
তবে সম্পাদনা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। একাধিক ঘটনা ও চরিত্র থাকায় গল্পের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সংযোগ সব সময় স্বাভাবিক মনে হয়নি। দ্রুত দৃশ্য পরিবর্তন এবং এক ঘটনার পর আরেক ঘটনা আসায় কিছু অংশ জটিল হয়ে উঠেছে বলেও মত রয়েছে।
৭. শেষটা জমকালো, কিন্তু প্রত্যাশিত আবেগ কি মিলল?
সিনেমার শেষ দিকে বরফে ঘেরা পরিবেশে বড় পরিসরের অ্যাকশন দৃশ্য রয়েছে। একই সঙ্গে যশের চরিত্রকে অতীতের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও ভুলের মুখোমুখি হতে দেখা যায়। দ্বৈত চরিত্রের উপস্থিতিও গল্পের শেষ অংশে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
দৃশ্যায়ন ও অ্যাকশনের দিক থেকে ক্লাইম্যাক্স নজরকাড়া হলেও গল্পের এতটা পথ পেরিয়ে যে আবেগঘন সমাপ্তির প্রত্যাশা তৈরি হয়, তা পুরোপুরি পূরণ হয়নি বলে মনে করছেন কিছু সমালোচক। শেষ পর্যন্ত সিনেমা দর্শকের সামনে কিছু প্রশ্ন রেখে যায়।
সব মিলিয়ে, ‘টক্সিক’ বড় আয়োজন, তারকাখ্যাতি, অ্যাকশন ও চোখধাঁধানো দৃশ্যের কারণে আলোচনায় থাকলেও গল্পের গভীরতা, নারী চরিত্রের বিকাশ, আবেগ এবং সম্পাদনা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বক্স অফিসে সাফল্যের পাশাপাশি দর্শকের এই মিশ্র প্রতিক্রিয়া সিনেমাটিকে ঘিরে আলোচনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।