লন্ডনের একটি রেস্তোরাঁর ইতিহাস যেন ব্রিটেনের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরই অংশ। চার্লস ডিকেন্সের মতো বিখ্যাত সাহিত্যিক থেকে শুরু করে পপ তারকা ম্যাডোনা—অনেক পরিচিত মানুষ অতিথি হয়েছেন এই রেস্তোরাঁয়। দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কারণে জায়গাটি এখনো দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের।
রেস্তোরাঁটির নাম ‘রুলস’। ১৭৯৮ সালে টমাস রুল এটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে টানা সেবা দিয়ে আসা এই প্রতিষ্ঠানটির বয়স এখন ২২৮ বছর। রেস্তোরাঁটির নিজস্ব দাবি, এটি লন্ডনের সবচেয়ে পুরোনো রেস্তোরাঁ।
‘রুলস’ অবস্থিত লন্ডনের ওয়েস্ট এন্ডের কোভেন্ট গার্ডেনে। ঐতিহাসিক এই এলাকায় সারা বছরই পর্যটক ও স্থানীয়দের ভিড় থাকে। পুরোনো ইনডোর মার্কেট, রাস্তার শিল্পীদের পরিবেশনা, কেনাকাটার নানা সুযোগ এবং বিভিন্ন খাবারের জন্য কোভেন্ট গার্ডেন বেশ জনপ্রিয়।
বাইরে থেকেই লাল পতাকা ও সোনালি নকশার ছাউনির কারণে রেস্তোরাঁটি সহজে নজরে পড়ে। আর ভেতরে ঢুকলেই বর্তমান সময়ের সঙ্গে অতীতের এক অদ্ভুত মিশেল অনুভব করা যায়।
দেয়ালে ঝুলছে পুরোনো আয়না, বিভিন্ন আবক্ষ ভাস্কর্য, হাতে আঁকা ছবি, কার্টুন ও অসংখ্য শিল্পকর্ম। এসবের মধ্যেই জায়গা পেয়েছে রেস্তোরাঁটির বিখ্যাত অতিথিদের প্রতিকৃতিও। ফলে খাবারের পাশাপাশি এখানকার পরিবেশও অনেকটা জাদুঘরের মতো মনে হয়।
রেস্তোরাঁটির কাচের জানালায় সোনালি অক্ষরে লেখা রয়েছে—‘ঝিনুক, পাই, পুডিং’। নামগুলোতেই ধরা পড়ে ঐতিহ্যবাহী ব্রিটিশ খাবারের ছাপ। মেনুতে খরগোশসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর মাংসের খাবার রয়েছে। রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষের দাবি, যুক্তরাজ্যের অন্য যেকোনো রেস্তোরাঁর তুলনায় এখানে বন্যপ্রাণীর মাংস দিয়ে তৈরি খাবারের বৈচিত্র্য বেশি। ডেজার্টেও পুরোনো ব্রিটিশ রন্ধন ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
শুধু বাস্তব জীবনের অতিথিদের কারণেই নয়, সিনেমা ও টেলিভিশনের পর্দাতেও ‘রুলস’-এর আলাদা পরিচিতি রয়েছে। জনপ্রিয় ব্রিটিশ সিরিজ ‘ডাউনটন অ্যাবি’ থেকে শুরু করে জেমস বন্ডের চলচ্চিত্র ‘স্পেক্টার’—বিভিন্ন আলোচিত প্রযোজনায় রেস্তোরাঁটির ডাইনিং রুম দেখা গেছে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বে রয়েছেন রিকি ম্যাকমেনেমি। প্রায় ৩৭ বছর ধরে তিনি রেস্তোরাঁটির সঙ্গে যুক্ত। কর্মজীবনের শুরুতে ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও পরে ২০২২ সালে ‘রুলস’-এর মালিক হন।
ম্যাকমেনেমির কাছে রেস্তোরাঁটি কেবল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়। তিনি এটিকে নিজের সন্তানের মতো মনে করেন। তাঁর মতে, ‘রুলস’-এর এমন একটি নিজস্ব আকর্ষণ রয়েছে, যা মানুষকে সহজেই টেনে নেয় এবং জায়গাটির প্রতি এক ধরনের আবেগ তৈরি করে।
দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকা এই রেস্তোরাঁ তাই শুধু খাবারের জায়গা নয়; এটি লন্ডনের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পুরোনো আতিথেয়তার এক জীবন্ত নিদর্শন।