নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও নতুন করে কৌতূহল তৈরি করেছে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, প্রবল স্রোতে আশপাশের বিভিন্ন স্থাপনা ভেসে গেলেও নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি সবুজ রঙের বহুতল ভবন অক্ষত রয়েছে। এ দৃশ্য দেখে কেউ এটিকে অলৌকিক ঘটনা বলছেন, আবার কেউ মনে করছেন এটি ভবন নির্মাণের প্রকৌশলগত সক্ষমতার উদাহরণ।
তবে প্রকৌশল বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবনটির টিকে যাওয়ার পেছনে বেশ কিছু বাস্তব কারণ কাজ করেছে।
ঘটনাটি নেপালের নুওয়াকোট জেলার ত্রিশূলী শহরের। আকস্মিক বন্যার সময় মাত্র প্রায় আধা ঘণ্টায় নদীর পানির উচ্চতা ৯ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, হিমালয়ের কোনো অংশে হিমবাহ ভেঙে যাওয়ার পর বরফ, কাদামাটি ও পাথরের বিশাল স্রোত নদীতে নেমে আসায় এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এর ফলে নদীসংলগ্ন বহু বাড়ি ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত বা ধসে পড়ে।
কিন্তু সবুজ রঙের ওই বহুতল ভবনটি ভয়াবহ স্রোতের মধ্যেও টিকে যায়। ইউনিভার্সিটি অব দ্য সানশাইন কোস্টের প্রকৌশল বিভাগের প্রধান অ্যাড্রিয়ান ম্যাককালামের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভবনটির শক্ত কংক্রিট কাঠামো এবং স্টিলের রড দিয়ে তৈরি ফ্রেম এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে ভবনের ভিত্তি শক্ত পাথুরে স্তরের ওপর স্থাপন করা থাকায় স্রোতের প্রচণ্ড চাপও এটি সামলাতে সক্ষম হয়।
ভবনটির অবস্থানও এর সুরক্ষায় বড় ভূমিকা রেখেছে। স্থাপনাটির উজানে থাকা একটি উঁচু প্রাকৃতিক ভূখণ্ড নদীর মূল স্রোতকে দুই দিকে ভাগ করে দেয়। ফলে বন্যার পানির সর্বোচ্চ চাপ সরাসরি ভবনের গায়ে গিয়ে পড়েনি।
ভবনটির নকশাগত বৈশিষ্ট্যও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। উঁচু ভিত্তির কারণে পানির একটি অংশ ভবনের নিচ দিয়ে প্রবাহিত হতে পেরেছে। এতে কাঠামোর ওপর পানির সরাসরি চাপ তুলনামূলকভাবে কমে যায়। অস্ট্রেলিয়ার ঐতিহ্যবাহী কুইন্সল্যান্ডার বাড়ির নকশার সঙ্গে এ ধরনের কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যের কিছুটা মিল রয়েছে।
ভবনের মালিক প্রকাশ জানান, নদীর কাছাকাছি হওয়ায় বাড়ি নির্মাণের সময় ঝুঁকির বিষয়টি মাথায় রাখা হয়েছিল। ভিত্তি শক্ত করতে নিচে একাধিক স্তরের উপকরণ ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি উন্নত মানের সিমেন্ট ও রড ব্যবহার করায় ভবনটি সাধারণ ইট-পাথরের দেয়ালের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে।
প্রকৌশলগত দিক থেকে ভবনটির কংক্রিট ফ্রেম ও স্টিলের রড একসঙ্গে একটি শক্ত কাঠামো তৈরি করেছে। কলাম, বিম ও ভিত্তি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকায় পানির চাপ একক কোনো অংশে পুরোপুরি কেন্দ্রীভূত হয়নি। বরং চাপ পুরো কাঠামোয় ছড়িয়ে পড়েছে এবং পরে তা ভিত্তির মাধ্যমে মাটিতে স্থানান্তরিত হয়েছে।
এ ছাড়া নদীর প্রবাহের দিক ও ভবনের অবস্থানও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সহায়তা করেছে। ভবনটি প্রবল স্রোতের একেবারে কেন্দ্রে না থাকায় বড় পাথর, গাছের গুঁড়ি ও অন্যান্য ভাসমান ধ্বংসাবশেষের সরাসরি আঘাত থেকে কিছুটা সুরক্ষা পেয়েছে। ভবনের আকৃতিও পানির প্রবাহকে দুই পাশে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে।
অর্থাৎ, ভবনটির টিকে যাওয়া কোনো রহস্য বা অলৌকিকতার বিষয় নয়। শক্ত ভিত্তি, রিইনফোর্সড কংক্রিট, সঠিক নির্মাণ কৌশল, ভবনের উচ্চতা এবং নদীর স্বাভাবিক গতিপথ—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবেই ভয়াবহ বন্যার মধ্যেও ভবনটি দাঁড়িয়ে থাকতে পেরেছে।