নিখোঁজ স্বজনের ছবি হাতে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটছেন মানুষ। কারও হাতে স্কুলপোশাক পরা সন্তানের ছবি, কারও কাছে সদ্যবিবাহিত স্বামীর ছবি, আবার কেউ খুঁজছেন বাবা, ভাই কিংবা ছোট্ট শিশুকে। নেপালের হাসপাতালের দেয়ালজুড়ে এখন এমন অসংখ্য ছবি। প্রতিটি ছবির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি প্রশ্ন—প্রিয় মানুষটি কোথায়?
নেপালের কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালের দেয়ালগুলো যেন পরিণত হয়েছে নিখোঁজ মানুষের খোঁজের এক নীরব বার্তাবাহকে। স্বজনেরা ছবি সাঁটিয়ে দিচ্ছেন এবং আশা করছেন, কেউ হয়তো ছবির মানুষটিকে চিনতে পারবেন।
হিমবাহধস থেকে সৃষ্ট ভয়াবহ পানির স্রোতে নেপালের বিভিন্ন এলাকা ও তিব্বতের কিছু অংশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু গ্রাম ও বসতি পানির স্রোতে ভেসে গেছে। দুর্ঘটনার পর থেকে হাজারো মানুষের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
শনিবার সকাল পর্যন্ত নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা প্রায় তিন হাজারে পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। নেপালে এখন পর্যন্ত শত শত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্গম এলাকাগুলোর অনেক জায়গায় এখনো স্থলপথে পৌঁছানো সম্ভব নয়। ফলে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারের ওপর নির্ভর করে চলছে উদ্ধার তৎপরতা।
নিখোঁজের পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্ত করাও কর্তৃপক্ষের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেপালের চিতওয়ান শহরের মর্গগুলোতে বিপুলসংখ্যক মরদেহ সংরক্ষণ করতে গিয়ে তৈরি হয়েছে সংকট। জায়গার অভাবে অস্থায়ী ভবনেও মরদেহ রাখা হচ্ছে।
প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়া কিছু মরদেহ নেপালের সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের বিভিন্ন এলাকাতেও পাওয়া গেছে। ফলে স্বজনদের কাছে প্রিয়জনের কোনো খবর পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
দুর্যোগের কয়েক দিন পরও কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালে মানুষের ভিড় কমেনি। কেউ পুলিশের কাছে নিখোঁজ স্বজনের তথ্য দিচ্ছেন, কেউ হাসপাতালের আহতদের তালিকা খুঁজছেন। অনেকেই এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরে বেড়াচ্ছেন—যদি কোথাও প্রিয়জনের সন্ধান মেলে।
রাসুয়া জেলার জায়দাদা গ্রামের ইয়াভরাজ লামার চার স্বজনও নিখোঁজ। তাঁর বোন, ভগ্নিপতি ও তাঁদের দুই সন্তান দুর্যোগের পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। পুরো গ্রামটি ভয়াবহ ঢলের পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হাসপাতালের দেয়ালে এক বছর বয়সী সিজান তাওয়াংয়ের ছবি সাঁটানোর সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন লামা। ছবিতে মায়ের কোলে থাকা শিশুটির পাশেই সাঁটানো হয় তার ১২ বছর বয়সী ভাই সাহিলের ছবি।
স্বজনদের উদ্ধারের আশা এখনো ছাড়তে চান না লামা। তবে পুরো গ্রাম ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তাঁদের জীবিত পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও গভীর অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি।
২২ বছর বয়সী মনিতা নেপালি হাসপাতালের দেয়ালে তাঁর স্বামী বিশাল নেপালির ছবি লাগিয়েছেন। মাত্র ছয় মাস আগে তাঁদের বিয়ে হয়েছিল।
পেশায় চালক বিশালকে প্রায়ই নেপাল-তিব্বত সীমান্ত এলাকায় যেতে হতো। দুর্যোগের দিন সকালে রাসুয়া এলাকায় হাঁটতে বের হওয়ার আগে স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। সন্ধ্যায় আবার ফোন করার কথা থাকলেও এরপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।
চার দিন পেরিয়ে গেলেও স্বামীর ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন মনিতা। তাঁর বিশ্বাস, বিশাল হয়তো কোথাও বেঁচে আছেন এবং একদিন ফিরে আসবেন।
৩৬ বছর বয়সী তুলমায়া তামাং হাসপাতালগুলোতে এসেছেন পরিবারের একাধিক সদস্যের ছবি নিয়ে। তাঁর পরিবারের প্রায় ১২ জন সদস্যের মধ্যে কয়েকজনের ছবি তিনি সঙ্গে এনেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছে মাত্র পাঁচ মাস বয়সী একটি শিশুও।
দুর্যোগের পর তাঁদের কারও সন্ধান পাওয়া যায়নি। স্বজনদের জীবিত ফিরে পাওয়ার আশা যতটা কমছে, অন্তত তাঁদের মরদেহ ফিরে পাওয়ার আকুতিও ততটাই বাড়ছে।
তুলমায়ার মতে, প্রিয়জনের মরদেহ পাওয়া গেলে পরিবার অন্তত শেষবারের মতো তাঁদের বিদায় জানাতে পারবে। তা না হলে এই অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার যন্ত্রণা দীর্ঘদিন থেকে যাবে।
নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন হিমালয়ের উঁচু এলাকায় ত্রিশূলী নদীর অববাহিকায় বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত শ্রমিকেরা। এসব প্রকল্পে কাজ করা শত শত মানুষের এখনো সন্ধান নেই। তাঁদের মধ্যে ভারতের নাগরিকও রয়েছেন।
প্রবল কাদার স্রোতে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর বিভিন্ন স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপালি সেনারা কয়েকটি প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে জীবিত ব্যক্তিদের উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিছু মানুষ এখনো ভূগর্ভস্থ অংশে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে উদ্ধারকারীদের ধারণা।
২৪ বছর বয়সী সুজন নেপালিও নিখোঁজ শ্রমিকদের একজন। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে রাতের পালার কাজ শেষে তিনি ঘুমাচ্ছিলেন। হঠাৎ প্রবল পানির স্রোত উপত্যকার দিকে নেমে এলে এরপর তাঁর আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
সুজনের বোন সুশিশা মালুওয়ার প্রতিদিন কাঠমান্ডুর হাসপাতালে যাচ্ছেন। আহতদের তালিকায় ভাইয়ের নাম আছে কি না, খুঁজে দেখছেন। হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে ভাইয়ের ছবি লাগিয়েও সন্ধান চালাচ্ছেন তিনি।
দিন পেরিয়ে গেলেও আশা ছাড়েননি সুশিশা। তাঁর বিশ্বাস, সুজন হয়তো কোনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, উদ্ধারকারীদের কাছে আছেন কিংবা কোনোভাবে বিপদ থেকে বের হয়ে বেঁচে আছেন।
নেপালের হাসপাতালের দেয়ালে এখন একের পর এক ছবি সাঁটানো হচ্ছে। প্রতিটি ছবির সঙ্গে একটি পরিবার, একটি গল্প এবং একটি অপেক্ষা জড়িয়ে আছে।
কেউ সন্তানের জন্য, কেউ বাবার জন্য, কেউ সদ্যবিবাহিত স্বামীর জন্য, আবার কেউ ভাইয়ের সন্ধানে দিন গুনছেন। কারও মনে এখনো প্রিয়জন ফিরে আসার আশা। আর কারও চাওয়া শুধু একটি নিশ্চিত খবর—জীবিত কিংবা মৃত।
দেয়ালে সাঁটানো সেই মুখগুলো তাই শুধু ছবি নয়; প্রতিটি ছবি হয়ে উঠেছে একটি পরিবারের শেষ আশার প্রতীক।