ইসলাম মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। তাই একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো আল্লাহর ওপর ভরসা করার পাশাপাশি বাস্তব জীবনে প্রয়োজনীয় সতর্কতাও অবলম্বন করা। ট্রাফিক আইন মেনে চলা, নিরাপদ গতিতে গাড়ি চালানো এবং নিজের ও অন্যের জীবনের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার পাশাপাশি সফরের জন্য বর্ণিত দোয়া ও আমলগুলো পালন করা যেতে পারে।
বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে একটি দোয়া পড়ার কথা হাদিসে এসেছে।
দোয়াটি হলো—
بِسْمِ اللَّهِ، تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ، لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি, তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি, লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
অর্থ: আল্লাহর নামে বের হলাম। আমি আল্লাহর ওপর নির্ভর করলাম। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই।
আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তি ঘর থেকে বের হওয়ার সময় এই দোয়া পড়লে তাকে বলা হয়—তার জন্য যথেষ্ট করা হয়েছে, তাকে রক্ষা করা হয়েছে এবং শয়তান তার কাছ থেকে দূরে সরে গেছে।
—জামে তিরমিজি, হাদিস ৩৪২৬
গাড়ি, বাস, ট্রেন কিংবা অন্য কোনো বাহনে ওঠার সময় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা সুন্নাহর অংশ।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
‘পবিত্র ও মহান তিনি, যিনি এটিকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন; আমরা নিজেরা এটিকে বশীভূত করতে সক্ষম ছিলাম না। আর অবশ্যই আমরা আমাদের প্রতিপালকের কাছেই প্রত্যাবর্তনকারী।’
—সুরা জুখরুফ, আয়াত ১২-১৪
বাহনে আরোহণের সময় পড়া যায়—
سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَىٰ رَبِّنَا لَمُنقَلِبُونَ
উচ্চারণ: সুবহানাল্লাজি সাখখারা লানা হাযা, ওয়া মা কুন্না লাহু মুকরিনীন। ওয়া ইন্না ইলা রব্বিনা লামুনকালিবুন।
অর্থ: পবিত্র ও মহান তিনি, যিনি এটিকে আমাদের অধীন করে দিয়েছেন। আমরা নিজেরা তা আয়ত্তে আনতে সক্ষম ছিলাম না। আর অবশ্যই আমরা আমাদের রবের কাছেই ফিরে যাব।
সফরে বের হওয়ার সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর কাছে কল্যাণ, তাকওয়া ও সফর সহজ হওয়ার জন্য দোয়া করতেন।
দোয়াটি হলো—
اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ فِي سَفَرِنَا هَذَا الْبِرَّ وَالتَّقْوَى، وَمِنَ الْعَمَلِ مَا تَرْضَى، اللَّهُمَّ هَوِّنْ عَلَيْنَا سَفَرَنَا هَذَا، وَاطْوِ عَنَّا بُعْدَهُ، اللَّهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ، وَالْخَلِيفَةُ فِي الْأَهْلِ، اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ وَعْثَاءِ السَّفَرِ، وَكَآبَةِ الْمَنْظَرِ، وَسُوءِ الْمُنْقَلَبِ فِي الْمَالِ وَالْأَهْلِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকা ফি সাফারিনা হাযাল বিররা ওয়াত তাকওয়া, ওয়া মিনাল আমালি মা তারদা। আল্লাহুম্মা হাওয়িন আলাইনা সাফারানা হাযা, ওয়াতউই আন্না বুদাহু। আল্লাহুম্মা আনতাস-সাহিবু ফিস-সাফারি, ওয়াল-খলিফাতু ফিল-আহলি। আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিন ওয়া‘ছা-ইস-সাফারি, ওয়া কা-আবাতিল মানজারি, ওয়া সুইল মুনকালাবি ফিল আহলি ওয়াল-মালি।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমাদের এই সফরে আমরা তোমার কাছে কল্যাণ, তাকওয়া এবং তোমার পছন্দনীয় কাজ করার তাওফিক চাই। আমাদের এই সফর সহজ করে দাও এবং এর দূরত্ব আমাদের জন্য সংক্ষিপ্ত করে দাও। সফরে তুমিই আমাদের সঙ্গী এবং পরিবারের জন্য তুমিই আমাদের রক্ষাকর্তা। সফরের কষ্ট, দুঃখজনক পরিস্থিতি এবং পরিবার ও সম্পদের ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থায় ফিরে আসা থেকে আমরা তোমার আশ্রয় চাই।
—সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৩৪২
দোয়া পড়া একজন মুমিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে দোয়ার পাশাপাশি নিজের দায়িত্ব পালন করাও জরুরি। গাড়িতে ওঠার আগে দোয়া পড়লেই নিরাপত্তার সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়—ইসলাম এমন শিক্ষা দেয় না।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
‘তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।’
—সুরা বাকারা, আয়াত ১৯৫
তাই চালকের উচিত নির্ধারিত গতিসীমা মেনে গাড়ি চালানো। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ঘুম, অসুস্থতা কিংবা অতিরিক্ত ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো উচিত নয়। চালক ও যাত্রী উভয়েরই সিটবেল্ট ব্যবহার করা এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলা প্রয়োজন।
একইভাবে পথচারীদেরও রাস্তা পারাপারের সময় সতর্ক থাকতে হবে।
তাওয়াক্কুলের অর্থ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা বাদ দিয়ে শুধু আল্লাহর ওপর নির্ভর করা নয়। বরং নিজের সাধ্য অনুযায়ী সতর্কতা ও ব্যবস্থা গ্রহণ করে ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করাই প্রকৃত তাওয়াক্কুলের শিক্ষা।
মানুষের জীবন আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া মূল্যবান আমানত। তাই নিজের জীবনকে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকির মধ্যে ফেলা যেমন অনুচিত, তেমনি অন্যের জীবন বিপন্ন করে গাড়ি চালানোও গুরুতর দায়িত্বহীনতা।
সড়কে নিরাপদ থাকার জন্য তিনটি বিষয় একসঙ্গে প্রয়োজন—সচেতনতা, সতর্কতা ও দোয়া।
চালককে দায়িত্বশীল হতে হবে, যাত্রীকে নিরাপত্তাবিধি মেনে চলতে হবে এবং সবাইকে আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা কামনা করতে হবে।
ঘর থেকে বের হওয়ার সময় অল্প কিছুক্ষণ আল্লাহকে স্মরণ করা, বাহনে ওঠার সময় তাঁর মহত্ত্ব ঘোষণা করা এবং সফরে তাঁর কাছে কল্যাণ ও নিরাপত্তা চাওয়া একজন মুসলিমের দৈনন্দিন জীবনে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে পারে।
আমরা জানি না প্রতিটি যাত্রার পথে সামনে কী অপেক্ষা করছে। তবে আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে অবগত এবং তিনিই সর্বোত্তম রক্ষাকর্তা।
তাই প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করে, সুন্নাহর দোয়া পাঠ করে এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে পথ চলা উচিত।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সড়ক দুর্ঘটনা, বিপদ-আপদ ও সব ধরনের অনিষ্ট থেকে হেফাজত করুন। আমাদের প্রতিটি সফর নিরাপদ ও কল্যাণময় করুন এবং সুস্থভাবে আপনজনদের কাছে ফিরে আসার তাওফিক দান করুন। আমিন।