কারণ সমাজের সাধারণ মানুষ তাদের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের আচরণ ও জীবনধারা অনুসরণ করে। ক্ষমতাবান ও বিত্তশালীরা যখন সংযম, দায়িত্ববোধ ও আল্লাহভীতির পরিবর্তে ভোগ-বিলাসকে জীবনের আদর্শ বানান, তখন সেই প্রবণতা ধীরে ধীরে সমাজের অন্য স্তরেও ছড়িয়ে পড়ে। একসময় অপচয় ও ভোগবাদ স্বাভাবিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে যেতে পারে।
ইসলাম তাই শুধু ব্যক্তিগত পাপ থেকে বেঁচে থাকার কথা বলেনি; বরং যাদের হাতে অর্থ, ক্ষমতা ও নেতৃত্ব রয়েছে, তাদের দায়িত্বের বিষয়েও সতর্ক করেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখন আমি কোনো জনবসতি ধ্বংস করতে চাই, তখন তার সমৃদ্ধিশালী লোকদের (সৎকর্ম করতে) নির্দেশ দিয়ে থাকি। কিন্তু তারা সেখানে অসৎ কাজ করতে থাকে। আর তখন (আজাবের) ফায়সালা ওই জনবসতির ওপর অবধারিত হয়ে যায়। আমি তা সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত করে দিই।’
—সুরা ইসরা, আয়াত ১৬
অতএব, সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যদি সম্পদ ও ক্ষমতাকে আল্লাহর দেওয়া আমানত হিসেবে ব্যবহার না করে অন্যায়, অপচয় ও ভোগ-বিলাসে ডুবে যান, তাহলে তার নেতিবাচক প্রভাব কেবল ব্যক্তিজীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না।
অতিরিক্ত আরাম-আয়েশ মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে স্বাচ্ছন্দ্যনির্ভর মানসিকতা তৈরি করতে পারে। ফলে পরিশ্রম, ত্যাগ ও দায়িত্ব পালনের আগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
যে ব্যক্তি সব সময় নিজের আরাম ও ভোগের চিন্তায় মগ্ন থাকে, তার জন্য সমাজ, দেশ, মানবকল্যাণ কিংবা দ্বিনের প্রয়োজনে ত্যাগ স্বীকার করা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
ইসলাম অবশ্য হালাল সম্পদ অর্জনকে নিষিদ্ধ করেনি। বরং বৈধ পথে উপার্জন করে তা সঠিক কাজে ব্যয় করার শিক্ষা দিয়েছে। তবে সম্পদ যেন মানুষের হৃদয়ের নিয়ন্ত্রক হয়ে না ওঠে, সে বিষয়ে সতর্ক করেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা জেনে রাখো, পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া, কৌতুক, শোভা, পারস্পরিক গর্ব এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে পরস্পরের আধিক্য লাভের প্রতিযোগিতা ছাড়া কিছু নয়।’
—সুরা হাদিদ, আয়াত ২০
দুনিয়ার সম্পদ ও সৌন্দর্য স্থায়ী নয়। তাই এগুলোকে জীবনের চূড়ান্ত সাফল্যের মাপকাঠি বানানো একজন মুমিনের জন্য উচিত নয়। প্রকৃত সফলতা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং আখিরাতে মুক্তি লাভ করা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের দুনিয়ার অতিরিক্ত ভোগ-বিলাস সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। মুআজ ইবনে জাবাল (রা.)-কে ইয়েমেনে পাঠানোর সময় তিনি তাকে বিলাসিতা থেকে দূরে থাকার উপদেশ দেন।
হাদিসে এসেছে, ‘হে মুআজ! তুমি বিলাসিতা থেকে বেঁচে থেকো। কেননা আল্লাহর বান্দারা বিলাসী জীবনযাপন করে না।’
—শুআবুল ঈমান, হাদিস ৫৭৬৬
এখানে মূল শিক্ষা হলো—একজন মুমিনের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য আরাম-আয়েশ নয়। এমন ভোগ-বিলাস নিন্দনীয়, যা মানুষকে ইবাদত, আল্লাহর স্মরণ, আত্মসংযম এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ব থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
দুনিয়ার বিপুল সম্পদ, বড় বাড়ি কিংবা মূল্যবান সামগ্রী মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারণ করে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যদি (দুনিয়ার মোহে) সব মানুষ একাট্টা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা না থাকত, তাহলে যারা পরম করুণাময়কে অস্বীকার করে, আমরা তাদের দিতাম তাদের ঘরের জন্য রৌপ্য নির্মিত ছাদ ও সিঁড়ি... এবং স্বর্ণনির্মিত আসবাবপত্র। আর এগুলো সব পার্থিব জীবনের ভোগ্যবস্তু ছাড়া কিছুই নয়। আর আখিরাত তোমার রবের কাছে মুত্তাকিদের জন্য।’
—সুরা জুখরুফ, আয়াত ৩৩-৩৫
এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দুনিয়ার বিপুল সম্পদ আল্লাহর কাছে মর্যাদার নিশ্চয়তা নয়। বরং তাকওয়াই হলো প্রকৃত মর্যাদার ভিত্তি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুনিয়ায় এমনভাবে থাকো যেন তুমি একজন অপরিচিত ব্যক্তি অথবা একজন পথিক।’
—সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৪১৬
একজন পথিক যেমন কোনো জায়গাকে নিজের চূড়ান্ত ঠিকানা মনে করেন না, তেমনি মুমিনের কাছেও দুনিয়া চূড়ান্ত গন্তব্য নয়। তার আসল লক্ষ্য আখিরাতের স্থায়ী জীবন।
মুহাম্মদ (সা.) চাইলে দুনিয়ার সবচেয়ে আরামদায়ক জীবন বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি মানুষের সামনে ত্যাগ, সংযম, পরিশ্রম ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
তিনি ক্ষুধা ও কষ্ট সহ্য করেছেন, সাহাবিদের সঙ্গে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন এবং ইসলামের দাওয়াতের পথে নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করেছেন। তাঁর জীবন থেকে স্পষ্ট হয়, আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য বানালে দুনিয়ার আরাম সব সময় অগ্রাধিকার পায় না।
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, কখনো কখনো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পরিবারের ঘরে টানা কয়েক মাস রান্নার আগুন জ্বলত না; খেজুর ও পানি দিয়েই সময় পার করতে হতো।
—সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৪৫৯
এর অর্থ দারিদ্র্যকে কামনা করা নয়। বরং এর মাধ্যমে বোঝা যায়, আল্লাহর রাসুলের জীবনে দুনিয়ার ভোগ-বিলাস কখনো মূল লক্ষ্য ছিল না।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবায়ে কিরামও দুনিয়ার আরামের চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
তাঁদের কেউ ঘরবাড়ি ও সম্পদ ছেড়ে হিজরত করেছেন, কেউ দ্বিনের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন, আবার কেউ জ্ঞান অর্জন ও প্রচারের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন।
তাঁদের ত্যাগ ও সংগ্রামের ফলেই পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলামের বাণী পৌঁছে যায়। আজ আমরা যে তুলনামূলক নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশে দ্বিনের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছি, তার পেছনে রয়েছে পূর্ববর্তী প্রজন্মের অসংখ্য মানুষের ত্যাগ ও শ্রম।
একজন সমাজনেতার পরিচয় তার গাড়ি, বাড়ি, পোশাক কিংবা জীবনযাপনের চাকচিক্যে নয়। তার প্রকৃত পরিচয় হওয়া উচিত সততা, আমানতদারি, ন্যায়পরায়ণতা, মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং আল্লাহভীতি।
সম্পদশালীদের মনে রাখা প্রয়োজন—সম্পদ আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া একটি আমানত। ক্ষমতাবানদের উচিত ক্ষমতাকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো। আর নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের উচিত নিজেদের আচরণকে সমাজের জন্য ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।
কারণ নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের জীবন সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে। তারা অপচয় করলে অপচয়কে স্বাভাবিক মনে করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। তারা দুর্নীতিতে জড়ালে অন্যরাও উৎসাহিত হতে পারে। বিপরীতে তারা সৎ, সংযমী ও আল্লাহভীরু হলে সমাজেও নৈতিকতার চর্চা বাড়তে পারে।
দুনিয়ার কোনো বড় অর্জন সাধারণত শ্রম ছাড়া আসে না। কৃষক ফসলের জন্য পরিশ্রম করেন, শিক্ষার্থী সফলতার জন্য অধ্যবসায় করে এবং ব্যবসায়ী সাফল্যের জন্য ঝুঁকি নেন।
তাহলে আখিরাতের চিরস্থায়ী সফলতা অর্জনের পথ কি ত্যাগ ও পরীক্ষামুক্ত হবে? অবশ্যই নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা কি মনে করেছ যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, অথচ এখনো তোমাদের কাছে তাদের অবস্থা আসেনি, যারা তোমাদের পূর্বে অতীত হয়েছে? তাদের ওপর এসেছে দুঃখ-কষ্ট ও বিপদ-আপদ...।’
—সুরা বাকারা, আয়াত ২১৪
তাই একজন মুমিনের জীবনে পরিশ্রম, ধৈর্য ও আত্মসংযম থাকা স্বাভাবিক।
বিলাসী কোনো জীবনযাপনকে শুধু বাহ্যিকভাবে বিচার করাই যথেষ্ট নয়। ইসলাম হালাল সম্পদ বা বৈধ স্বাচ্ছন্দ্যকে নিষিদ্ধ করেনি। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন ভোগ-বিলাস মানুষের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্যে পরিণত হয়।
অতিরিক্ত ভোগ যদি অহংকার সৃষ্টি করে, অপচয়ের অভ্যাস তৈরি করে, মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ কমিয়ে দেয় কিংবা আল্লাহর আনুগত্য ও আখিরাতের চিন্তা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তখন সেটি ব্যক্তি ও সমাজ—উভয়ের জন্যই ক্ষতির কারণ হতে পারে।
তাই সম্পদ থাকলে তা নিয়ে অহংকার না করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা, প্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় করা, অভাবীদের পাশে দাঁড়ানো এবং নিজের জীবনকে সংযমের মধ্যে রাখা উচিত।
কারণ সমাজের প্রকৃত সৌন্দর্য অট্টালিকা, বিলাসবহুল গাড়ি কিংবা সম্পদের প্রদর্শনীতে নয়; বরং ন্যায়, সততা, মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও আল্লাহভীতিতে।