বিশেষ করে কোনো নির্দিষ্ট চেসিসের ওপর কী ধরনের বডি নির্মাণ করা যাবে, সেই কাঠামো যাত্রী পরিবহনের জন্য কতটা নিরাপদ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন যথাযথভাবে নেওয়া হয়েছে কি না—এসব বিষয় নিয়ে পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কে একটি স্লিপার কোচ দুর্ঘটনার পর বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে। ওই দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনায় যানটির কাঠামো, চেসিস এবং অনুমোদন সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্ন সামনে আসে। একই সঙ্গে দেশে আমদানি করা চেসিসের ওপর স্থানীয়ভাবে বডি নির্মাণ করে তা যাত্রীবাহী বাস হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়ম-কানুন কতটা মানা হচ্ছে, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
সড়ক দুর্ঘটনা নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু একটি আধুনিক স্লিপার কোচ দুর্ঘটনায় পড়লে সাধারণ বাসের তুলনায় এর কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে আলাদা করে প্রশ্ন ওঠে। কারণ স্লিপার কোচে যাত্রীদের অবস্থান, বেড বা স্লিপিং বার্থের বিন্যাস, গাড়ির অভ্যন্তরীণ কাঠামো এবং ওজনের ভারসাম্য সাধারণ বাসের তুলনায় ভিন্ন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি গাড়ির চেসিস আমদানি করার পর সেটির ওপর যে বডি নির্মাণ করা হবে, সেই বডির নকশা অবশ্যই সংশ্লিষ্ট যানবাহনের কারিগরি সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। অতিরিক্ত ওজন, ভুলভাবে ওজন বণ্টন কিংবা অনুমোদিত নকশার বাইরে কাঠামো পরিবর্তন করা হলে দুর্ঘটনার সময় ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তাই প্রশ্ন হচ্ছে—দেশে চলাচলকারী স্লিপার কোচগুলোর ক্ষেত্রে এসব বিষয় নিয়মিতভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে কি না?
একটি যাত্রীবাহী বাস রাস্তায় নামার আগে একাধিক ধাপ অতিক্রম করার কথা। চেসিস আমদানি, বডি নির্মাণ, নিবন্ধন, ফিটনেস পরীক্ষা এবং সড়কে চলাচলের অনুমোদন—প্রতিটি ধাপেই নির্দিষ্ট নিয়ম থাকার কথা।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, বাস্তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমদানি করা চেসিসের ওপর এমনভাবে বডি নির্মাণ করা হচ্ছে, যা সংশ্লিষ্ট চেসিসের মূল নকশা বা অনুমোদিত ব্যবহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
পরিবহন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু কাগজপত্র ঠিক থাকলেই একটি বাসকে নিরাপদ বলা যায় না। গাড়ির প্রকৃত কাঠামো, ওজন, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা, ব্রেকিং সিস্টেম, টায়ার, সাসপেনশন, জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা এবং যাত্রী ধারণক্ষমতাও পরীক্ষা করা জরুরি।
আপনার দেওয়া প্রতিবেদনে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘ইফাদ অটোস’-এর নাম উল্লেখ করে বিভিন্ন অভিযোগ ও প্রশ্ন তুলে ধরা হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে চেসিস আমদানি, বিক্রি এবং পরবর্তী সময়ে সেগুলোতে বডি নির্মাণের বিষয়ও রয়েছে। তবে কোনো অভিযোগকে তদন্ত বা প্রমাণ ছাড়া চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।
এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চেসিসের আমদানি সংক্রান্ত নথি, বিক্রয় সংক্রান্ত তথ্য, বডি নির্মাণের অনুমোদন, নিবন্ধনের কাগজপত্র এবং ফিটনেস পরীক্ষার নথি পর্যালোচনা করলেই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের অভিযোগ সত্য কি না, সেটি নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের।
কোনো বাস দুর্ঘটনার পর শুধু চালকের ভুল বা সড়কের পরিস্থিতিকে দায়ী করলেই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে দুর্ঘটনায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হলে গাড়িটির কারিগরি অবস্থা এবং কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
সেক্ষেত্রে তদন্তে দেখা যেতে পারে—
বাসটির প্রকৃত চেসিস কোন মডেলের;
চেসিসটি কী উদ্দেশ্যে আমদানি করা হয়েছিল;
এর ওপর নির্মিত বডির নকশা অনুমোদিত কি না;
বডি নির্মাণে নির্ধারিত কারিগরি মান অনুসরণ করা হয়েছে কি না;
বাসটির নিবন্ধন ও ফিটনেস সনদ বৈধ ছিল কি না;
নির্ধারিত ওজনের তুলনায় অতিরিক্ত ওজন বহন করা হচ্ছিল কি না;
ব্রেক, টায়ার ও সাসপেনশন ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না;
বাসটিতে প্রয়োজনীয় জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা ছিল কি না।
এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা অনেক সহজ হবে।
দেশে দূরপাল্লার যাত্রায় আরামদায়ক পরিবহনের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্লিপার কোচের জনপ্রিয়তাও বাড়ছে। অনেক যাত্রী দীর্ঘ যাত্রায় বসে থাকার পরিবর্তে শুয়ে বা আধা-শোয়া অবস্থায় ভ্রমণ করতে আগ্রহী।
ব্যবসায়িক দিক থেকেও এই ধরনের বাস পরিবহন খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে নতুন প্রযুক্তি বা নতুন ধরনের যানবাহন বাজারে আসার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা বিধিমালাও যুগোপযোগী করা প্রয়োজন।
কারণ যাত্রী পরিবহনে আরাম যতটা গুরুত্বপূর্ণ, নিরাপত্তা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, আমদানি করা একটি চেসিসের ওপর স্থানীয়ভাবে বডি নির্মাণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কারিগরি মান অনুসরণ করা প্রয়োজন। বডির আকার বা কাঠামো পরিবর্তনের ফলে গাড়ির ভারসাম্যে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা জরুরি।
একই সঙ্গে কোনো বাসের বডি নির্মাণের পর সেটি অনুমোদিত নকশার সঙ্গে মিলছে কি না, তা যাচাই না করে শুধু কাগজপত্রের ভিত্তিতে ফিটনেস দেওয়া হলে ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এ কারণে বডি বিল্ডিং প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও নজরদারি বাড়ানোর দাবি রয়েছে।
একটি বাস সড়কে চলাচলের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন ও ফিটনেস পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাওয়ার কথা। সেখানে গাড়িটির কাঠামো এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা করার কথা রয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—বাসের বডিতে পরবর্তীতে বড় ধরনের পরিবর্তন করা হলে সেই পরিবর্তন আবার নতুন করে পরীক্ষা করা হয় কি না।
ধরা যাক, একটি চেসিস নির্দিষ্ট ধরনের যানবাহনের জন্য তৈরি। পরে সেটির ওপর এমন একটি বডি নির্মাণ করা হলো, যাতে যাত্রী ধারণক্ষমতা ও মোট ওজন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেল। তখন আগের অনুমোদন দিয়েই নতুন কাঠামোকে নিরাপদ ধরে নেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত—এ প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
দূরপাল্লার বাসে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করেন। ফলে একটি বাসের কারিগরি ত্রুটি শুধু একজন যাত্রীর নয়, একই সঙ্গে অনেক মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
বিশেষ করে রাতের বেলায় চলাচলকারী স্লিপার কোচে দুর্ঘটনা ঘটলে যাত্রীদের দ্রুত বের হয়ে আসার সুযোগ সীমিত হতে পারে। তাই জরুরি দরজা, জানালা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং নিরাপদ বহির্গমন পথ কার্যকর অবস্থায় থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে বাসের ভেতরে অতিরিক্ত সাজসজ্জা বা পরিবর্তন করে জরুরি বহির্গমন পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কি না, সেটিও নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে অনেক সময় চালকের ওপর পুরো দায় চাপানো হয়। কিন্তু একটি যাত্রীবাহী বাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু চালকের নয়।
বাসের মালিক, অপারেটর, বডি নির্মাতা, আমদানিকারক, রক্ষণাবেক্ষণকারী এবং নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ—প্রত্যেকেরই নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব রয়েছে।
বাসটি যদি যান্ত্রিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ হয়, তাহলে চালককে সেটি চালাতে বাধ্য করা উচিত নয়। আবার কোনো যানবাহনের অনুমোদন বা ফিটনেসে সমস্যা থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
স্লিপার কোচ নিয়ে যে অভিযোগ ও প্রশ্ন উঠেছে, তার সমাধান হতে পারে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে।
কোনো আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান নিয়ম মেনে কাজ করলে তদন্তেই তা স্পষ্ট হবে। আবার কোনো পর্যায়ে অনিয়ম, ভুল তথ্য, অনুমোদনহীন পরিবর্তন কিংবা নিয়ম ভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়।
সড়কে নিরাপদ যাত্রী পরিবহন নিশ্চিত করতে শুধু নতুন ও আধুনিক বাস নামানোই যথেষ্ট নয়। সেই বাসের চেসিস থেকে শুরু করে বডি নির্মাণ, নিবন্ধন, ফিটনেস, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সড়কে চলাচল—প্রতিটি পর্যায়ে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
স্লিপার কোচ যাত্রীদের জন্য আরামদায়ক পরিবহনের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু আরামের সঙ্গে যদি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না থাকে, তাহলে সেই সুবিধাই একসময় বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
তাই চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কের সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাসহ স্লিপার কোচ সংক্রান্ত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা, সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা এবং প্রয়োজন হলে নিয়ম ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সংস্কার আনা এখন সময়ের দাবি।
যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে একটি বিষয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—যে বাসই সড়কে নামুক, সেটি যেন অনুমোদিত, কারিগরিভাবে নিরাপদ এবং নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী পরিচালিত হয়।