সরকারি হাসপাতালে অনেক সময় জরুরি ওষুধ বা চিকিৎসাসামগ্রীর প্রয়োজন হলেও নির্দিষ্ট খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকে না। আবার অন্য কোনো খাতে অর্থ অব্যবহৃত থাকলেও তা দ্রুত প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। কারণ, দেশের স্বাস্থ্য বাজেট মূলত নির্দিষ্ট খাত বা লাইন আইটেমভিত্তিক।
হঠাৎ কোনো চিকিৎসাযন্ত্র নষ্ট হওয়া, বড় দুর্ঘটনা, রোগের প্রাদুর্ভাব, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা অগ্নিকাণ্ডের মতো পরিস্থিতিতে দ্রুত অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রচলিত বাজেট ব্যবস্থায় সেই অর্থ দ্রুত ছাড় করা কঠিন হয়ে পড়ে।
স্বাস্থ্য খাতের এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে একটি জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল গঠনের প্রস্তাব করা যেতে পারে। এই তহবিলের মাধ্যমে জরুরি পরিস্থিতিতে হাসপাতালগুলোকে দ্রুত অর্থ দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।
এ জন্য পৃথক ‘জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল আইন’ করা যেতে পারে। আইনে তহবিলের অর্থের উৎস, ব্যবহারের ক্ষেত্র, জরুরি ক্রয়, নিরীক্ষা ও জবাবদিহির বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। তহবিল পরিচালনার জন্য একটি স্বায়ত্তশাসিত কর্তৃপক্ষও গঠন করা যেতে পারে।
জাতীয় বাজেট থেকে নির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি বিভিন্ন খাত থেকেও তহবিলের অর্থ সংগ্রহের সুযোগ রাখা যেতে পারে। মোবাইল টেলিযোগাযোগ খাত, ওষুধশিল্প, ব্যাংক, বিমা, বেসরকারি হাসপাতাল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সিএসআর তহবিল, উন্নয়ন সহযোগী এবং ব্যক্তি ও প্রবাসীদের স্বেচ্ছা অনুদানও সম্ভাব্য উৎস হতে পারে।
তবে তহবিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে নমনীয়তা ও জবাবদিহির সমন্বয়। নিয়মিত বেতন-ভাতা, ওষুধ, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যয়ের জন্য প্রচলিত বাজেট ব্যবস্থা থাকবে। আর জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল থেকে জরুরি ও স্থানীয়ভাবে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যসেবার জন্য ব্লক গ্র্যান্ট দেওয়া যেতে পারে।
শুধু কত টাকা ব্যয় হয়েছে, তা দিয়ে স্বাস্থ্য খাতের সাফল্য পরিমাপ না করে কতজন রোগী সেবা পেলেন, কত দ্রুত সেবা দেওয়া হলো, প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া গেল কি না, রোগীর অপেক্ষার সময় কতটা কমল এবং চিকিৎসার ফলাফল কী হলো—এসব বিষয়ও বিবেচনায় আনা যেতে পারে।
জরুরি প্রয়োজনে সরকারি হাসপাতালে কোনো নির্দিষ্ট সেবা দেওয়ার সক্ষমতা না থাকলে অনুমোদিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও নির্ধারিত মূল্যে সেই সেবা কেনার সুযোগ রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি রোগের প্রাদুর্ভাব বা বড় দুর্যোগ মোকাবিলায় তহবিলের একটি অংশ জরুরি স্বাস্থ্য তহবিল হিসেবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
তবে অর্থ ব্যবহারে নমনীয়তার পাশাপাশি জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি। ডিজিটাল ব্যবস্থায় প্রতিটি টাকার ‘বরাদ্দ → ব্যয় → সেবা → ফলাফল’ অনুসরণ করা যেতে পারে। কে কত টাকা পেলেন, কী কাজে ব্যয় করলেন এবং এর মাধ্যমে কী সেবা দেওয়া হলো—এসব তথ্য উন্মুক্ত ড্যাশবোর্ডে প্রকাশ করা যেতে পারে। আর্থিক নিরীক্ষার পাশাপাশি পারফরম্যান্স অডিটের ব্যবস্থাও রাখা যেতে পারে।
স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা শুধু অর্থের ঘাটতি নয়; প্রয়োজনের সময় অর্থ দ্রুত ও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে না পারাও বড় সমস্যা। তাই প্রশ্ন শুধু ‘কত টাকা খরচ হলো’—এতে সীমাবদ্ধ না রেখে ‘সেই অর্থে কতটা স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হলো এবং মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন এল’—সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল এমন একটি ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করতে পারে, যার মাধ্যমে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত অর্থ ছাড়, প্রয়োজনভিত্তিক ব্যয় এবং স্বাস্থ্যসেবার ফলাফলের সঙ্গে অর্থায়নের সম্পর্ক তৈরি করা সম্ভব হবে। শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্য বাজেটের সাফল্য শুধু কত টাকা ব্যয় হয়েছে তা দিয়ে নয়, সেই অর্থে কত মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন সুরক্ষিত হয়েছে তা দিয়েও মূল্যায়ন করা উচিত।