সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়নের জন্য ছয় মাসকে চূড়ান্ত সময়সীমা হিসেবে দেখা কঠিন। তবে এই সময়ের মধ্যে ভবিষ্যতে বড় সংকটে রূপ নিতে পারে—এমন কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা ইতিমধ্যে দৃশ্যমান কি না, সেটি পর্যালোচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে এসব ঝুঁকি সম্পর্কে সরকার কতটা সচেতন এবং তা মোকাবিলায় কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, সেটিও বিবেচনার বিষয়।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়েছে একটি দুর্বল রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশে। গণতন্ত্র কার্যকর রাখার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিনের চাপ ও পরিবর্তনের কারণে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে নতুন সরকারের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠানে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা এবং সেগুলোকে কার্যকর করা।
তবে সরকারের জন্য ইতিবাচক দিক হলো, তারা সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। এত বড় রাজনৈতিক সমর্থন সরকারকে অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেয়। এমন কিছু সংস্কারও এই সময়ে করা সম্ভব, যা তাৎক্ষণিকভাবে জনপ্রিয় না হলেও দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র ও জনগণের জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে।
এই বাস্তবতায় সরকারের কর্মকাণ্ডকে মূলত তিনটি দিক থেকে মূল্যায়ন করা যায়—প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য, সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের অংশগ্রহণ এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা।
আরও পড়ুন: রাতে সাজানো নাটক, ভোরে হামলা—যেভাবে হিটলারের ছকে শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ
একটি উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শুধু নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না। নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগের একটি জায়গা হলো, সরকারের উদ্যোগে এমন কিছু প্রতিষ্ঠান ও কাঠামো তৈরি বা শক্তিশালী করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বাড়াতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে সেই ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।
গুম কমিশন ও মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত আইনের খসড়াকে এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাষ্ট্রের হাতে ক্ষমতা থাকলেই তা নাগরিকের অধিকার সীমিত করার সুযোগ তৈরি করবে—এমন ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। শুধু সরকারের সদিচ্ছার ওপর নাগরিক অধিকার নির্ভর করতে পারে না; এমন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যাতে কোনো সরকার চাইলেও নির্বিচারে মানুষের অধিকার হরণ করতে না পারে।
আমলাতন্ত্রের ওপর সরকারের নির্ভরশীলতাও এ ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে কার্যকর করা প্রয়োজন হলেও অতিরিক্ত ক্ষমতাশালী আমলাতন্ত্র যেন নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন করতে না পারে, সে জন্য জবাবদিহি ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
কারণ কোনো সরকার রাতারাতি কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে না। ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার কাঠামো এমনভাবে পরিবর্তিত হতে পারে, যার ফল কয়েক বছর পর স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই শুরুতেই এই ধরনের ঝুঁকির জায়গাগুলো চিহ্নিত করা জরুরি।
গণতন্ত্রে জনগণের ভূমিকা শুধু ভোট দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় জনগণের মতামত জানানোর সুযোগ থাকতে হয়।
একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ দুই দিকেই হওয়া প্রয়োজন। জনগণ তাদের সমস্যা ও প্রত্যাশার কথা সরকারকে জানাবে, আবার সরকারও তার সিদ্ধান্তের কারণ, পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন সম্পর্কে জনগণকে পরিষ্কারভাবে অবহিত করবে।
কিন্তু বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ চলমান অর্থনৈতিক সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে জনগণের মতামত নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সরকার ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে পারে।
জনগণের মধ্যে হতাশা তৈরি হলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, গণতন্ত্র ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের মধ্যে যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, সময়ের সঙ্গে জনগণের কাছে সেই পার্থক্যটি অস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ধর্ম, বর্ণ, নৃগোষ্ঠী, লিঙ্গ বা অন্য কোনো পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষের মৌলিক অধিকার আলাদা হওয়ার সুযোগ নেই। প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপদে বেঁচে থাকা এবং নিজের ধর্ম ও সংস্কৃতি চর্চার অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এই জায়গায় সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাকে ঘিরে নতুন ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের সামাজিক বা ধর্মীয় মূল্যবোধ অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে—এমন অভিযোগ উঠছে। এ ধরনের প্রবণতাকে কেউ কেউ ‘সামাজিক স্বৈরতন্ত্র’ হিসেবে বর্ণনা করছেন।
এ ক্ষেত্রে ‘তৌহিদি জনতা’ শব্দটিও আলোচনায় এসেছে। সমালোচকদের মতে, শব্দটি অনেক সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক গোষ্ঠীকে বোঝাতে একটি বিস্তৃত পরিচয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সম্প্রতি সাভারে একটি ওরস বন্ধের উদ্যোগে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামি, ইসলামী ঐক্যজোট ও খেলাফত মজলিসের নেতাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে এসেছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা যদি এ ধরনের কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন এবং সংশ্লিষ্ট দলগুলো প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান না নেয়, তাহলে সব নাগরিকের অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
এ কারণে শুধু সরকার নয়, সব রাজনৈতিক দলের কাছেই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার প্রত্যাশা রয়েছে। কনসার্ট, সিনেমা প্রদর্শন, নৌকাবাইচসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আয়োজন বন্ধের মতো কর্মকাণ্ডে দলগুলোর অবস্থান কী—তা জনগণের কাছে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। কোনো দল এসব কর্মকাণ্ড সমর্থন না করলে তাদের নেতা-কর্মীদের এমন কার্যক্রম থেকে বিরত রাখতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেটিও প্রকাশ্যে জানানো গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে সরকারের প্রথম ছয় মাসে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির জায়গা সামনে এসেছে—ক্ষমতার সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের ঘাটতি, জনগণের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগের দুর্বলতা এবং নাগরিক ও সামাজিক অধিকার রক্ষায় অনিশ্চয়তা।
এই দুর্বলতাগুলো এখনই সমাধানের উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে এগুলো আরও বড় রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে বিপুল রাজনৈতিক সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় থাকা সরকারের জন্য এখনই প্রয়োজন সেই রাজনৈতিক পুঁজিকে দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহি ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় কাজে লাগানো।
সরকার এসব ঝুঁকি কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এবং আগামী দিনগুলোতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ।