দেশজুড়ে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে তীব্র গ্যাস–সংকট চলমান। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ কমে যাওয়ায় শিল্প উৎপাদন, আবাসিক রান্না এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ফলে গ্যাসের সংকটের পাশাপাশি লোডশেডিংও বেড়েছে, যা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মহেশখালীর আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল পুরোপুরি সচল করতে আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এদিকে টার্মিনালের ক্ষতিগ্রস্ত নয় এমন একটি বয়লার দ্রুত চালুর চেষ্টা চলছে। এটি চালু হলে প্রতিদিন প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে, যা বর্তমান সংকট কিছুটা লাঘব করতে পারে।
জানা গেছে, মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ইতোমধ্যে বিদেশ থেকে আনা হয়েছে এবং দেশি-বিদেশি প্রকৌশলীরা যৌথভাবে কাজ করছেন। তবে অক্ষত বয়লারটি ঠিক কবে চালু হবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত সময় জানানো হয়নি।
গ্যাস–সংকট মোকাবিলায় সরকার মালয়েশিয়া থেকে আইএসও ট্যাংকারে এলএনজি আমদানির সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পদ্ধতি ব্যয়বহুল এবং বাস্তবায়নে সময় লাগে। তাই দ্রুত সংকট নিরসনের প্রধান উপায় হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল পুনরায় চালু হওয়াকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পরিস্থিতির জন্য পেট্রোবাংলা ও তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে। তিতাস জানিয়েছে, পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তাদের আওতাধীন এলাকায় সব ধরনের গ্রাহককে গ্যাসের স্বল্পচাপের সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি একটি কারিগরি দুর্ঘটনার ফল এবং সরকার দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প জ্বালানির উৎস তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, পেট্রোবাংলা বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সিএনজি খাতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর একটি প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানা গেছে। প্রস্তাবে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৬৭ শতাংশ এবং সিএনজিতে প্রায় ৫১ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে মোহাম্মদপুর ও আদাবরে, অনেক পরিবার দিনের পর দিন রান্নার গ্যাস পাচ্ছেন না। অনেকেই গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেও চুলায় গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।
বর্তমানে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের বড় একটি অংশ এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু টার্মিনাল বন্ধ থাকায় দৈনিক সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। যেখানে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট, সেখানে সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২১১ কোটি ঘনফুটে।
গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমেছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসের স্বল্পতার কারণে দেড় হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে, লোডশেডিং বেড়েছে। একই সঙ্গে অনেক পরিবার রান্নার জন্য বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার শুরু করায় বিদ্যুতের চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
শিল্প খাতেও সংকট তীব্র। নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও ভালুকাসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ অত্যন্ত কম থাকায় অনেক কারখানা আংশিক সক্ষমতায় চলছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। বিকল্প হিসেবে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ডিজেলচালিত জেনারেটর কিংবা নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে।
বিশ্ববাজারে এলএনজির উচ্চমূল্যের কারণে পেট্রোবাংলার আর্থিক চাপও বেড়েছে। গত অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে বড় অঙ্কের লোকসান হয়েছে এবং সরকারকে উল্লেখযোগ্য ভর্তুকি দিতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম এখনও তুলনামূলক বেশি থাকায় ভবিষ্যতেও এই চাপ অব্যাহত থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।
ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকটে সাধারণ মানুষ ভুগছেন। অনেক গ্রাহক পর্যাপ্ত গ্যাস না পেলেও নির্ধারিত বিল পরিশোধ করছেন। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যবৃদ্ধির পরিবর্তে গ্রাহকদের জন্য বিলে বিশেষ ছাড় বা অন্যান্য সহায়তা দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।