ঢাকার পল্টনের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ ইনডোর স্টেডিয়ামে চলছে উন্মুক্ত প্রাইজমানি র্যাঙ্কিং টেবিল টেনিস টুর্নামেন্ট। প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা খেলোয়াড়দের ব্যস্ততায় সরগরম স্টেডিয়াম। এবারের প্রতিযোগিতায় বিশেষভাবে নজর কেড়েছে রংপুরের খেলোয়াড়দের উপস্থিতি ও পারফরম্যান্স।
১৯৫৯ সালে যাত্রা শুরু করা রংপুর টেবিল টেনিস সংস্থা বর্তমানে জেলা পর্যায়ে দেশের অন্যতম সক্রিয় টিটি কেন্দ্র। সাবেক জাতীয় চ্যাম্পিয়ন মোস্তফা বিল্লাহর মতে, ফলাফলের বিচারে হয়তো রংপুর এখনো শীর্ষে নয়, তবে টেবিল টেনিসের নিয়মিত চর্চা ও খেলোয়াড় তৈরির দিক থেকে জেলাটি দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় জায়গাগুলোর একটি।
চলমান প্রতিযোগিতায় এর প্রমাণও পাওয়া যাচ্ছে। বিকেএসপি থেকে সর্বোচ্চ ৪২ জন খেলোয়াড় অংশ নিয়েছেন। এর পরেই রয়েছে রংপুর টিটি সংস্থা থেকে আসা ৩২ জন খেলোয়াড়।
রংপুরের টিটি চর্চার ইতিহাসও বেশ পুরোনো। সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন প্রয়াত আকমল তাজ। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সেখানে নিয়মিত আখতার মেমোরিয়াল টেবিল টেনিস টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হতো। এসব প্রতিযোগিতায় পাকিস্তান ও পশ্চিমবঙ্গের দলও অংশ নিত। সেই সময় রংপুরে টেবিল টেনিসের জন্য তিনটি টেবিল ছিল, যেখানে ঢাকার অনেক ক্লাবেও ছিল মাত্র একটি করে টেবিল।
বর্তমানেও সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে রংপুর। সংস্থাটির খেলোয়াড় মোহতাসিন আহমেদ এখন জাতীয় চ্যাম্পিয়ন এবং শীর্ষ র্যাঙ্কিংধারীদের একজন।
তবে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেই এগিয়ে যেতে হচ্ছে সংস্থাটিকে। একসময় সরকারি সহায়তা পাওয়া গেলেও কয়েক বছর ধরে তা কমে গেছে। বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতাও খুব বেশি নেই। এমনকি গত দুই বছরের বিদ্যুৎ বিলও বকেয়া রয়েছে।
রংপুর শহরের নিউ ইঞ্জিনিয়ারপাড়ায় প্রায় ২৪ শতক জায়গার ওপর সংস্থাটির নিজস্ব একতলা ভবন রয়েছে। সেখানে চারটি টেবিলে সপ্তাহের সাত দিনই অনুশীলন করেন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন খেলোয়াড়। বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতাতেও রংপুরের বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান খেলোয়াড় রয়েছে। অনূর্ধ্ব-১৫ বালক বিভাগে দেশের শীর্ষ র্যাঙ্কিংধারী খেলোয়াড়ও রংপুরের।
সংস্থাটির কোচ শামীম সাব্বির জানান, খেলোয়াড়দের বিনা খরচে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রায় পাঁচজন কোচ নিয়মিত কাজ করছেন। পর্যাপ্ত সহযোগিতা পাওয়া গেলে আরও ভালো খেলোয়াড় তৈরি করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
এবারের চার দিনব্যাপী টুর্নামেন্টে সারা দেশ থেকে ৩৯৩ জন খেলোয়াড় নিবন্ধন করেছেন। সবচেয়ে ছোট খেলোয়াড়দের বয়স ৭-৮ বছর, আবার ৭০ বছর বয়সীরাও অংশ নিচ্ছেন। একক ইভেন্টে অংশ নিতে প্রত্যেককে ৫১০ টাকা করে এন্ট্রি ফি দিতে হয়েছে।
একসময় বাংলাদেশের টেবিল টেনিসের অন্যতম কেন্দ্র ছিল যশোর। পরে নব্বইয়ের দশকে সেই জায়গা দখল করে নেয় নড়াইল। জাতীয় পর্যায়ে একাধিক চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড় তৈরি করেছে জেলাটি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নড়াইলে টিটি চর্চার সেই জৌলুস অনেকটাই কমেছে।
চলমান প্রতিযোগিতায় নড়াইল থেকে অংশ নিয়েছেন মাত্র তিনজন—দুজন পুরুষ ও একজন নারী খেলোয়াড়। খেলোয়াড় সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে বিকেএসপিতে অনেকের চলে যাওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে। বর্তমানে বিকেএসপির ৪২ জন টিটি খেলোয়াড়ের মধ্যে আটজনই নড়াইলের।
দিনাজপুর থেকেও এবারের প্রতিযোগিতায় মাত্র একজন খেলোয়াড় এসেছেন। কুষ্টিয়া ও গাইবান্ধা থেকেও অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা খুবই কম। তবে এই চিত্রের বিপরীতে আশার আলো দেখাচ্ছে কুমিল্লার লালপুর নজরুল ইসলাম উচ্চবিদ্যালয়। স্কুলটি থেকে পাঁচজন ছেলে ও পাঁচজন মেয়েসহ মোট ১০ জন খুদে খেলোয়াড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে।
ফলে পুরোনো কেন্দ্রগুলোর পাশাপাশি রংপুর ও লালপুরের মতো নতুন জায়গাগুলো বাংলাদেশের টেবিল টেনিসে নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে।