কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার শাপলাপুর এলাকায় সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে। স্থানীয়দের যাতায়াতের সুবিধার কথা বলা হলেও বন বিভাগের দাবি, এই সড়ক নির্মাণের ফলে বন দখলের প্রবণতা বাড়তে পারে এবং বনের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জেএম ঘাট থেকে সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ একটি মেঠোপথ চলে গেছে। পথটির বিভিন্ন অংশে ইতিমধ্যে কংক্রিটের কাজ করা হয়েছে। দুই পাশে পাহাড়ের ঢালে ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও পানের বরজ গড়ে উঠেছে। বন বিভাগের নথিতে এসব বসতিকে অবৈধ দখল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সড়কের নির্মাণকাজে শ্রমিকদের ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে। কাজ তদারককারীদের একজন মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, সড়কটি হলে শাপলাপুর থেকে পাশের কালামারছড়া ইউনিয়নে যাতায়াত সহজ হবে। স্থানীয় বাসিন্দারাও নির্মাণকাজে সহযোগিতা করছেন বলে জানান তিনি।
ওই এলাকায় বসবাসকারী ব্যক্তিদের জমির মালিকানা সম্পর্কে জানতে চাইলে ইদ্রিস জানান, সেখানে বসবাসকারীদের অধিকাংশই সরকারি জমিতে রয়েছেন এবং তাঁদের কাছে জমির মালিকানার কাগজ নেই।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫৭ সালে বন আইন-১৯২৭-এর ২০ ধারার অধীনে শাপলাপুরের ১২ নম্বর পাহাড় মৌজাকে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করা হয়। এই বনভূমির আয়তন প্রায় ১৮ হাজার ২৮৬ একর।
বন বিভাগের দাবি, সংরক্ষিত বনের ভেতরে অবৈধভাবে ঘরবাড়ি ও দোকানপাট নির্মাণ করে চার হাজারের বেশি মানুষ বসবাস করছে। প্রস্তাবিত সড়কটি নির্মিত হলে এসব বসতির বাসিন্দারা সরাসরি সুবিধা পাবেন এবং এর ফলে বনভূমিতে নতুন করে দখল বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের শাপলাপুর বিট কর্মকর্তা মিল্টন চন্দ্র সরকার বলেন, বন আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত বনের মধ্যে এ ধরনের স্থাপনা বা অবকাঠামো নির্মাণের সুযোগ নেই। বন বিভাগ কাজ বন্ধ করার চেষ্টা করলেও বাধা উপেক্ষা করে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন তিনি। এ ঘটনায় মামলা করা হয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
সড়কটি নির্মাণ করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ২২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।
উপজেলা প্রকৌশলী বনি আমিন বলেন, সড়কটি স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য প্রকল্পভুক্ত করা হয়েছে। এটি নির্মিত হলে শাপলাপুরের সঙ্গে পাশের ইউনিয়নের দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার থেকে কমে সাড়ে চার কিলোমিটারে নেমে আসবে বলে জানান তিনি। তবে সড়ক নির্মাণে আদালতের নিষেধাজ্ঞার কথা শুনেছেন এবং এ বিষয়ে আদেশের নথি এখনো পাননি বলেও জানান তিনি।
সড়ক নির্মাণ নিয়ে বন বিভাগের আপত্তির পর স্থানীয় সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ প্রশাসনিক সহায়তার জন্য বন বিভাগকে চিঠি দেন বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। জবাবে বন বিভাগ জানায়, এলাকাটি সংরক্ষিত বন হওয়ায় প্রচলিত আইনে সেখানে সড়ক নির্মাণের সুযোগ নেই।
বন বিভাগের চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, এই বন চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, পাহাড়ি কচ্ছপ, মুখপোড়া হনুমান, অজগরসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী ও সরীসৃপের আবাসস্থল। সড়ক নির্মাণের ফলে প্রাণীদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি গাছপালা ও বনের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিবেশবাদীদেরও একই ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) মহেশখালী শাখার নেতা আমিনুল হক বলেন, বনের ভেতরে থাকা অবৈধ বসতি ও স্থাপনাগুলো সড়ক নির্মাণের মাধ্যমে আরও সুবিধা পাবে। এতে অবশিষ্ট বনভূমিও দখলের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বাপার সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, মহেশখালী দেশের গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি জীববৈচিত্র্যের একটি এলাকা। সংরক্ষিত বনের মধ্যে সড়ক নির্মাণের ফলে বনভূমি উজাড় ও দখলের সুযোগ বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এদিকে বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন-২০২৬ অনুযায়ী, প্রাকৃতিক বনকে বনবহির্ভূত কাজে ব্যবহারের বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে। জাতীয়ভাবে অপরিহার্য কোনো প্রকল্পের ক্ষেত্রে বিকল্প না থাকলে পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন, ক্ষতিপূরণমূলক বনায়ন এবং সংশ্লিষ্ট অনুমোদনের বিধান রাখা হয়েছে।
সংরক্ষিত বন, বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিদ্যমান আইন ও পরিবেশগত বিধিবিধান মেনে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়টি তাই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।