বিদেশে দীর্ঘ সময় কাজ করেও স্থায়ীভাবে সফল হতে পারেননি কক্সবাজারের পেকুয়ার জমির উদ্দিন। দেশে ফিরে কখনো প্রসাধনীর ব্যবসা, আবার কখনো সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া দিয়ে আয় করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কোনো উদ্যোগেই দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত কৃষিকে পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি।
কৃষি বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না থাকলেও নতুন কিছু শেখার জন্য ইউটিউব ও গুগলের সাহায্য নেন জমির। সেই অনলাইন জ্ঞান কাজে লাগিয়ে চার একর জমিতে গড়ে তুলেছেন মিশ্র ফলের বাগান। প্রথমবার ফলন পাওয়ার পরই প্রায় ২২ লাখ টাকার ফল বিক্রি করে সাড়া ফেলেছেন তিনি।
পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের সোনাইছড়ি এলাকার রমিজপাড়ায় জমির উদ্দিনের বাগান। পাহাড়ঘেরা এই বাগানে সারি সারি মাল্টা, কমলা, জাম্বুরা ও পেয়ারা গাছ দেখা যায়। বর্তমানে প্রতিটি গাছেই ফল ধরেছে। ফলকে পোকামাকড় ও রোগবালাই থেকে রক্ষা করতে কিছু ফল পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। শ্রমিকেরা নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার ও গাছের পরিচর্যা করছেন।
২০২৩ সালে চার একর জমি বর্গা নিয়ে বাগান তৈরির কাজ শুরু করেন জমির উদ্দিন। বর্তমানে তাঁর বাগানে প্রায় ১ হাজার ৪০০টি পেয়ারা গাছ, ৭৮০টি বারি-১ জাতের মাল্টা, ২০টি বারোমাসি মাল্টা, ২৫০টি জাম্বুরা এবং ২৫০টি দার্জিলিং কমলার গাছ রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসব ফলের চারা সংগ্রহ করেছেন তিনি। বাগান তৈরি, জমির উন্নয়ন, চারা কেনা, শ্রমিকের মজুরি, সেচ, সার, কীটনাশক, বেড়া দেওয়া এবং ফল প্যাকেটজাত করার সরঞ্জামসহ দুই বছরে তাঁর প্রায় ৩২ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।
গত বছর বাগান থেকে প্রথমবার ফল সংগ্রহ শুরু হয়। স্থানীয় বাজারে মাল্টা ও পেয়ারা বিক্রি করে প্রায় ২২ লাখ টাকার ফল বিক্রি করতে সক্ষম হন তিনি। চলতি মৌসুমেও ভালো ফলনের আশা করেছিলেন। তবে বন্যার কারণে এবার বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
জমির উদ্দিন জানান, জুলাইয়ের শুরুতে বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে তাঁর বাগান প্রায় ছয় দিন পানির নিচে ছিল। এতে বিপুল পরিমাণ ফল নষ্ট হয়। প্রায় ৩৫ হাজার পেয়ারা ও ১০ হাজার মাল্টা গাছ থেকে ঝরে পড়ে। পাশাপাশি প্রায় ৭০০টি ফলগাছ মারা যায়।
সব মিলিয়ে বন্যায় তাঁর আনুমানিক ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তারপরও চলতি মৌসুমে প্রায় ১৭ লাখ টাকার ফল বিক্রির প্রত্যাশা করছেন তিনি।
বর্তমানে স্থানীয় বাজারে মাল্টা কেজিপ্রতি প্রায় ১২০ থেকে ১৫০ টাকা এবং পেয়ারা ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের পাইকাররাও সরাসরি বাগানে এসে ফল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
জমির উদ্দিনের বিশ্বাস, দেশে থেকেই পরিকল্পিতভাবে কৃষিকাজ করলে ভালো আয় করা সম্ভব। তাঁর মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে কোনো বছর ক্ষতি হলেও দীর্ঘমেয়াদে বাগান থেকে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব।
২০০০ সালে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় সৌদি আরবে পাড়ি জমান জমির উদ্দিন। প্রায় নয় বছর সেখানে থাকার পর দেশে ফিরে প্রসাধনীর ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসায় লোকসান হওয়ায় ২০১২ সালে আবার কাতারে যান। ২০১৬ সালে দেশে ফিরে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া দেওয়ার ব্যবসায় নামেন।
একসময় পাঁচটি অটোরিকশা কিনলেও নানা সমস্যার কারণে শেষ পর্যন্ত সেগুলো বিক্রি করে দেন। এরপর কৃষির দিকে ঝুঁকে পড়েন তিনি।
২০১৮ সালে পাঁচ একর জমিতে পেঁপে চাষ শুরু করেন। কিন্তু প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ায় পরের বছর প্রায় ২ হাজার ২৫০টি কলাগাছ লাগান। কলা চাষ থেকে এক মৌসুমে প্রায় আট লাখ টাকা লাভ হলেও পরবর্তী মৌসুমে ফলন কমে যায়। একপর্যায়ে সেই বাগানও বাদ দিতে হয়।
তবে কৃষির প্রতি আগ্রহ হারাননি জমির। ২০২৩ সালে চার একর জমি নিয়ে শুরু করেন মিশ্র ফলের বাগান। এবার একসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ফল চাষের সিদ্ধান্ত নেন, যাতে একটি ফসলের বাজারমূল্য কমে গেলেও অন্য ফল থেকে আয় করা যায়।
কৃষি বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না থাকায় প্রযুক্তিকেই শেখার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন জমির। বাগানে কোনো রোগ বা সমস্যা দেখা দিলে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি গুগল ও ইউটিউব থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন তিনি।
জমির উদ্দিন বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আধুনিক পদ্ধতিতে কীভাবে ফলের বাগান করা হচ্ছে, সেসব সম্পর্কে ইউটিউব থেকে অনেক কিছু শেখা যায়। কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে অনলাইনে খুঁজে দেখেন। প্রয়োজন হলে কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেন।
পেকুয়ার পাহাড়ি অঞ্চলকে বিভিন্ন ফল চাষের জন্য সম্ভাবনাময় বলে মনে করছেন স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, এ অঞ্চলের মাটি মাল্টা, কমলা, লেবু, কাজুবাদাম ও কফিসহ বিভিন্ন ফসল চাষের জন্য উপযোগী।
জমির উদ্দিনের বাগানের বিশেষত্ব হলো একই জমিতে একাধিক ধরনের ফল উৎপাদন। ফলে কোনো একটি ফলের বাজারদর কমে গেলেও অন্য ফলের বিক্রি থেকে আয় করার সুযোগ থাকে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারাও বাগানটির বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখছেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরামর্শ দিচ্ছেন। তাঁদের মতে, পেকুয়ার পাহাড়ি এলাকায় জমির উদ্দিনের মতো মিশ্র ফলের বাগান আরও বাড়ানো গেলে স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।