কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে। এআই উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে থাকলেও চীন দ্রুত ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করছে। ফলে এআইয়ের উন্নয়নের গতি কমানো বা নিয়ন্ত্রণে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার প্রস্তাব নিয়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
শিক্ষা উদ্যোক্তা বরিস বুট প্রায় দুই বছর আগে বুঝতে পারেন, এআইকে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত না করলে ভবিষ্যতে তাঁর প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিদেশে সন্তানদের পড়াতে আগ্রহী অভিভাবকেরা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের তথ্যের বদলে চ্যাটবটের পরামর্শ ব্যবহার করছিলেন। এরপর তিনি নিজেই এআইভিত্তিক শিক্ষাসহায়ক ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ নেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এআইয়ের সক্ষমতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো চীনের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে। তবে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত উন্নতি করছে। এ কারণে দুই দেশের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতাও বাড়ছে।
এআইয়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিকভাবে উন্নয়নের গতি সমন্বয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই। তাঁর মতে, এ কাজে চীনের সঙ্গেও সহযোগিতা প্রয়োজন। তবে প্রযুক্তি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ওমদিয়ার গবেষক লিয়ান জে সু মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে এআই উন্নয়নের গতি কমাতে চীন আগ্রহী নয়।
সু-এর মতে, চীনা সরকারের কাছে এআই একটি গুরুত্বপূর্ণ সার্বভৌম সক্ষমতা। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রযুক্তিগত ব্যবধান কমানোর প্রচেষ্টা থামাতে বেইজিং রাজি হবে না। চীন এ ধরনের উদ্যোগকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত সুবিধা ধরে রাখার প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখতে পারে।
সম্প্রতি চীন এআই নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেছে। এতে এআই এজেন্ট, উন্নত এআই মডেল, সাইবার নিরাপত্তা এবং ‘রিকার্সিভ সেলফ ইমপ্রুভমেন্ট’-এর মতো সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার কাঠামো রাখা হয়েছে।
গবেষক গ্যাব্রিয়েল ওয়াগনারের মতে, এআই নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কিছু ধারণাগত মিল রয়েছে। তবে দেশ দুটির নীতিগত পদ্ধতিতে পার্থক্য আছে। চীনা সরকার রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এআইয়ের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় জোর দিচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এআইয়ের কারণে মানবসভ্যতা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাকে ‘ভাঁওতা’ বলে মন্তব্য করেছেন। আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের বৈঠকে এআই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বড় ধরনের সমঝোতা হবে কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
চীনে ২০২২ সাল থেকেই অ্যালগরিদম নিবন্ধনের ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে দেশটির নীতিতে শুধু এআই কী বলছে তা নয়, এআই কী করছে, সেটিও নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এআইভিত্তিক সঙ্গীদের সঙ্গে মানুষের অতিরিক্ত আবেগগত নির্ভরতা কমাতেও দেশটিতে নতুন বিধি করা হয়েছে।
তবে একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এআই ব্যবহারে জোর দিচ্ছে চীন। নতুন পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতেও এআইকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দেশটির শিল্পকারখানায় এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে এবং দৈনন্দিন জীবনেও প্রযুক্তিটির ব্যবহার দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে।
চীনা সমাজে এআই নিয়ে চাকরি হারানো ও ভুল তথ্য ছড়ানোর মতো উদ্বেগ থাকলেও অনেকেই এটিকে দৈনন্দিন জীবনের কার্যকর প্রযুক্তি হিসেবে দেখছেন। গবেষক নি তাও-এর মতে, চীনে এআইয়ের গতি কমানোর চেয়ে প্রযুক্তিটিতে দক্ষতা অর্জনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।