ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা আবারও বেড়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার নতুন পর্ব শুরু হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। এর মধ্যেই সামনে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই নির্বাচনই চলমান ইরান সংঘাতের পরবর্তী গতিপথে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সাম্প্রতিক রয়টার্স প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা নির্বাচনের আগে যুদ্ধের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছেন। রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষে নিজেদের অল্প ব্যবধানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে চাইছে। তাই নির্বাচনের আগে ইরান যুদ্ধ যেন মার্কিন ভোটারদের কাছে বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত না হয়, সেটিই এখন ওয়াশিংটনের অন্যতম বিবেচনা।
এই পরিস্থিতিতে ইরানের ওপর সামরিক চাপের পাশাপাশি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর পথ বেছে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং তেহরানের সঙ্গে ব্যবসা করা অন্য দেশগুলোকেও সতর্ক করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির আশপাশে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ও নৌ অবরোধ অব্যাহত রয়েছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি হওয়ায় এই প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব এখন শুধু পররাষ্ট্রনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার কারণে মার্কিন নাগরিকদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক রয়টার্স/ইপসোস জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক যুদ্ধকে সমর্থন করছেন, বিপরীতে ৬৩ শতাংশ এর বিরোধিতা করছেন। একই সময়ে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে।
আরেকটি সাম্প্রতিক জরিপে মাত্র ২৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মূল্যবান। অর্থনৈতিক চাপ ও যুদ্ধ নিয়ে ক্লান্তি নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তেল ও অন্যান্য জ্বালানির বাজারে চাপ তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও পড়ছে।
জ্বালানি ব্যয় বাড়লে পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়তে পারে। জীবনযাত্রার ব্যয় ইতোমধ্যেই মার্কিন ভোটারদের অন্যতম বড় উদ্বেগ। ফলে ইরান যুদ্ধ যদি নভেম্বরের নির্বাচনের আগে আরও তীব্র হয়, তাহলে অর্থনৈতিক চাপটি রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য রাজনৈতিক বোঝা হয়ে উঠতে পারে।
সংঘাতের মাত্রা কম দেখানোর রাজনৈতিক প্রচেষ্টারও ইঙ্গিত মিলছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সম্প্রতি বলেছেন, তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি ‘যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করতে চান না। একই সঙ্গে তিনি সংঘাতের শেষ হওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমাও দিতে পারেননি।
তবে বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা অব্যাহত রয়েছে। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার এই কৌশল কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সীমিত হামলা চালিয়ে একই সঙ্গে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ এড়িয়ে চলার কৌশল দীর্ঘদিন ধরে রাখা কঠিন। একটি হামলার জবাবে পাল্টা হামলা হলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে হামলা হয়েছে। ইরানও পাল্টা জবাব দেওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় ওয়াশিংটনের ওপর আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করছেন। তবে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
নির্বাচনে রিপাবলিকানরা ভালো ফল করলে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার রাজনৈতিক সুযোগ পেতে পারে। বিপরীতে কংগ্রেসের কোনো একটি বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালে প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক ও আইনগত চাপ বাড়তে পারে।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলে গেলে যুদ্ধসংক্রান্ত শুনানি, সামরিক ব্যয়ের অনুমোদন এবং প্রশাসনের সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্তের সুযোগও বাড়বে।
শুধু ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই নয়, ইরানের প্রতিক্রিয়াও সংঘাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। ইরান যদি মনে করে নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসন রাজনৈতিকভাবে বেশি চাপের মধ্যে রয়েছে, তাহলে তেহরানও সেই সময়কে নিজেদের কৌশল বাস্তবায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে পারে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে নির্বাচনের ফলাফল তাদের সামরিক নীতির পক্ষে জনসমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছে, তাহলে নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করবে না; চলমান ইরান সংঘাতের পরবর্তী গতিপথেও এর প্রভাব পড়তে পারে। নির্বাচন পর্যন্ত যুদ্ধের মাত্রা নিয়ন্ত্রিত থাকবে, নাকি তার আগেই নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হবে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।