বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬
৮ আশ্বিন ১৪৩৩

সদ্যপ্রাপ্ত

>> স্লুইসগেটের নিচে ভাসছিল প্লাস্টিকের ড্রাম, ভেতরে মিলল অর্ধগলিত মরদেহ

>> মিয়ানমার থেকে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে টেকনাফে নৌকাডুবি, রোহিঙ্গা মা-ছেলের মৃত্যু

>> সড়ক থেকে বাড়ি পর্যন্ত ২০ সিসিটিভি, হ্যাকিং ও মাদক মামলায় ৬ জন কারাগারে

>> জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় দুই অঙ্কের মূল্যস্ফীতির শঙ্কা

>> সাকিবসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে শেয়ারবাজার কারসাজির মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন ১৭ নভেম্বর

>> ‘আমার দুধের বাচ্চাকে কেন ভিকটিম ব্লেমিং করা হচ্ছে’—প্রশ্ন অপ্রতিমের মায়ের

>> চীনের যে কারখানায় প্রতি মাসে তৈরি হয় ৬০ লাখ স্মার্টফোন

>> দুই আইনজীবীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননা মামলার শুনানি হয়নি, নতুন তারিখ ২৬ অক্টোবর

>> শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সের টাকা প্রতিদিন গণনার সিদ্ধান্ত

>> সাগরে মাছ ধরার নৌযান বাড়ছে, কমছে ইলিশের আহরণ

আপনি পড়ছেন : বিশ্ব

‘কখনো কখনো মনে হয়, বেঁচে থাকাটাই অর্থহীন’—নেপালের বন্যায় স্বজনহারা শ্রমিক


Rabeya ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১:০৮



‘কখনো কখনো মনে হয়, বেঁচে থাকাটাই অর্থহীন’—নেপালের বন্যায় স্বজনহারা শ্রমিক


নেপালের ভয়াবহ পাহাড়ি ঢলে স্বজন ও ঘরবাড়ি হারিয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন বেঁচে যাওয়া মানুষজন। দেশটির বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে কর্মরত শ্রমিকদের অনেকেই এখনো নিখোঁজ। এর মধ্যেই প্রাণে বেঁচে ফেরা এক শ্রমিক জানিয়েছেন, পরিবারের ছয় সদস্যকে হারানোর পর তাঁর কাছে জীবনই অর্থহীন মনে হচ্ছে।

ত্রিশূলী নদীর ওপর নির্মাণাধীন একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে কাজ করছিলেন পেমবা দুনদু তামাং। তাঁর সঙ্গে সেখানে প্রায় ৩০ জন শ্রমিক কংক্রিটের আস্তরণ দেওয়ার কাজে নিয়োজিত ছিলেন।

হঠাৎ সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়ে পানি

তামাং জানান, কাজ চলার সময় আচমকাই সুড়ঙ্গের ভেতরে প্রবল বাতাস ঢুকে পড়ে। বাতাসের ধাক্কায় প্লাইউডের পাত উড়ে যায় এবং ভারী যন্ত্রপাতিও নড়েচড়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পরই দ্রুতগতিতে পানি ঢুকতে শুরু করে।

পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তিনি সুড়ঙ্গের প্রবেশপথের দিকে দৌড় দেন। তাঁর পেছন থেকে ঢলের পানি ধেয়ে আসছিল। প্রায় ২০ মিনিট দৌড়ানোর পর তিনি পাহাড়ের দিকে উঠে প্রাণ বাঁচান। পথে আঘাত পেয়ে একপর্যায়ে প্রায় অচেতন হয়ে পড়েছিলেন বলেও জানান তিনি।

পরিবারের ছয় সদস্য নিহত

প্রাণে বাঁচলেও তামাং হারিয়েছেন পরিবারের ছয়জনকে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন তাঁর মা, বড় ভাই, ভাবি এবং ভাইয়ের তিন সন্তান। ঢলের সময় তাঁরা নদীর কাছের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন।

তবে তামাংয়ের স্ত্রী, ছেলে ও এক ভাতিজা প্রাণে বেঁচে গেছেন।

তামাং বলেন, পাহাড়ে উঠে নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার পর শান্তিবাজার নামের একটি গ্রামে অন্য কয়েকজনের সঙ্গে আশ্রয় নেন। সেখানে দুই দিন থাকার পর সেনাবাহিনী তাঁদের উদ্ধার করে।

স্বজনদের হারানোর বেদনায় তিনি বলেন, এখন তাঁর কাছে বেঁচে থাকাটাই কষ্টকর মনে হচ্ছে। কোথায় খাবেন, কোথায় থাকবেন—কিছুই জানেন না তিনি।

সহকর্মীরও স্বজন হারানোর বেদনা

তামাংয়ের সহকর্মী ইথা ঘালেও ঢলের সময় প্রাণে বেঁচে যান। তাঁর পরিবারের আটজন সদস্য মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে তাঁর মা ও বড় মেয়ে রয়েছেন। তাঁর স্ত্রী ও তিন ছেলে অবশ্য বেঁচে গেছেন।

ঘালে জানান, সুড়ঙ্গ থেকে বের হওয়ার সময় বাতাসের প্রচণ্ড ঝাপটা তাঁদের প্রায় মাটি থেকে তুলে নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।

শত শত শ্রমিক আটকা পড়ার আশঙ্কা

নেপালে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ এই দুর্যোগে নিহতের সংখ্যা ইতিমধ্যে এক হাজার ছাড়িয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন চার হাজারের বেশি মানুষ।

নিখোঁজদের মধ্যে বিভিন্ন জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গে আটকে পড়া কয়েক শ শ্রমিকও থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এসব সুড়ঙ্গে এখন উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে। প্রকৌশলীরা আটকে পড়াদের কাছে পৌঁছাতে সুড়ঙ্গে বাতাস সরবরাহের ব্যবস্থাও করছেন।

নেপালের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত জানিয়েছেন, সুড়ঙ্গগুলোতে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি মরদেহ উদ্ধার এবং রোগের বিস্তার ঠেকাতেও সেনারা কাজ করছেন।

সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ১১৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।

আগামী বছর চালুর কথা ছিল প্রকল্পটির

যে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে তামাং ও তাঁর সহকর্মীরা কাজ করছিলেন, সেটি আগামী বছর চালু হওয়ার কথা ছিল। উজানে থাকা আরেকটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ব্যবহৃত পানি পুনরায় কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা ছিল। উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল।

প্রকল্পটিতে একাধিক দল আলাদাভাবে কাজ করছিল। তামাংয়ের ভাষ্য, বড় সুড়ঙ্গে কংক্রিটের আস্তরণ দেওয়ার যন্ত্র পরিচালনাকারী দলটি শেষের দিকে সুড়ঙ্গ থেকে বের হতে সক্ষম হয়।

বাইরে এসে তাঁরা দেখতে পান, তাঁদের বসতবাড়ি কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

আগাম সতর্কতা নিয়ে প্রশ্ন

বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগের কয়েক দিন আগে হিমবাহ এলাকায় অস্বাভাবিক কিছু পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। স্যাটেলাইটের ছবিতে হিমবাহের ওপরের অংশ দ্রুত সরে যাওয়ার পাশাপাশি বরফ গলে জমা পানির রং বাদামি হয়ে ওঠা এবং পাহাড়ি পাথরে ফাটলের চিহ্ন দেখা যায়।

এশিয়ান মাউন্টেন একাডেমিক অ্যালায়েন্স, স্টিমসন সেন্টার এবং চীনের ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেন হ্যাজার্ডস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের বিশেষজ্ঞরা এসব পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন।

তাঁদের মতে, এসব লক্ষণ পাহাড়ি এলাকায় অস্বাভাবিকতার ইঙ্গিত দেয়। তবে ঢলটি এত দ্রুত ও তীব্রগতিতে নিচের দিকে নেমে আসে যে কাছাকাছি অবস্থানরত মানুষকে প্রচলিত সতর্কবার্তা ব্যবস্থায় সময়মতো সতর্ক করা কঠিন ছিল।

তবে ভাটির দিকে পানি পৌঁছাতে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় লেগেছে—কোথাও ১০ মিনিট বা তারও বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেখানে কার্যকর সমন্বিত আগাম সতর্কব্যবস্থা থাকলে অনেক প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হতে পারত।

আটকে পড়াদের জীবিত উদ্ধারের আশা

বর্তমানে চীন, নেপাল ও ভারতের বিশেষজ্ঞরা উদ্ধার অভিযানে কাজ করছেন। ভারী যন্ত্রপাতি ও খননযন্ত্র ব্যবহার করে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর সুড়ঙ্গ থেকে ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে।

তামাংয়ের পরিচিত অনেক শ্রমিকও এখনো সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকা পড়ে আছেন। তাঁদের জীবিত উদ্ধারের আশা ছাড়তে চান না তিনি।

তামাং বলেন, সুড়ঙ্গে আটকে থাকা অনেক শ্রমিককে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন। তাঁদের কেউ এখনো বেঁচে থাকলে দ্রুত উদ্ধার করা হবে—এটাই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।