বন বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য, চেকপোস্টে অর্থ আদায়, ঘুষের বিনিময়ে সনদ প্রদান এবং বনভূমি দখলে সহায়তার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বন অধিদপ্তরের ঢাকা সামাজিক বনাঞ্চলের বন সংরক্ষক হোসাইন মুহাম্মদ নিশাদের বিরুদ্ধে। দীর্ঘ কর্মজীবনে প্রশাসনিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া এবং বিদেশে সম্পত্তি গড়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহলের ব্যক্তিরা।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠলেও, এ বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের ফলাফল বা অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কোনো তথ্য প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা যায়নি।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, হোসাইন মুহাম্মদ নিশাদ ২০০৩ সালে ২২তম বিসিএস (বন) ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে সহকারী বন সংরক্ষক পদে চাকরিতে যোগ দেন। অভিযোগ রয়েছে, কর্মজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য সময় সংস্থাপন শাখায় দায়িত্ব পালনের সুবাদে তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ, বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতেন।
সাবেক পরিবেশমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ এবং সাবেক বন উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগানোর অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘ প্রায় ২৩ বছরের চাকরিজীবনে তিনি রাজধানীর বাইরে বদলি হননি। তবে তাঁর কর্মস্থলের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস ও বদলিসংক্রান্ত সরকারি নথি যাচাই ছাড়া এ দাবির সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
বন বিভাগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জ, চেকপোস্ট ও লাইসেন্স কার্যক্রম ঘিরে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সক্রিয়তার অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্ধারণের দাবি উঠেছে।
অভিযোগের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে উঠে এসেছে ঢাকা সামাজিক বনাঞ্চলের সোনারগাঁও চেকপোস্ট। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক কাঠবোঝাই ট্রাক চলাচল করত এবং এসব যানবাহন থেকে অর্থ আদায় করা হতো।
অভিযোগে প্রতিদিন ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ট্রাক চলাচল এবং প্রতিটি ট্রাক থেকে ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায়ের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে চেকপোস্টের স্টেশন অফিসার পদে দায়িত্ব পেতে বছরে প্রায় ৫০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া ছয়জন সহকারী স্টেশন অফিসার ও বন প্রহরীদের পদায়ন ঘিরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। কাঠের ডিপো, করাতকল, ইটভাটা এবং বন্যপ্রাণী আমদানির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনাপত্তিপত্র বা এনওসি দেওয়ার বিনিময়ে প্রতিটি সনদে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
তবে এসব অর্থ লেনদেনের দাবি, ট্রাক চলাচলের সংখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট পদে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ বা পদায়নের বিষয়গুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে হোসাইন নিশাদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, রেঞ্জ অফিসারদের বদলির ক্ষেত্রে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা এবং বন প্রহরীদের ক্ষেত্রে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো বলে দাবি করা হয়েছে।
২০২০ সালের নভেম্বর মাসে নিয়োগবিধিতে পরিবর্তন এবং সরাসরি ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসার পদে প্রায় ১২০ জন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর নিয়োগের পেছনে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ভূমিকা ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নিয়োগবিধি সংশোধনের সরকারি নথি, নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের ভূমিকা যাচাই করা জরুরি।
এ ছাড়া আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ এবং গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলে দায়িত্ব পালনের সময় বনভূমির সীমানা নির্ধারণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার হেক্টর বনভূমি জবরদখল ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তবে জমির রেকর্ড, সীমানা নির্ধারণের নথি ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদন ছাড়া এ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা যায় না।
হোসাইন মুহাম্মদ নিশাদের বিরুদ্ধে তাঁর নিজের ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নামে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাবর সম্পত্তি গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি কানাডায় বিলাসবহুল বাড়ি এবং যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল সম্পত্তি কেনার তথ্য রয়েছে বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
এসব সম্পদের অর্থের উৎস এবং ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে বিদেশে সম্পত্তির মালিকানা, অর্থ পাচার কিংবা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নিশ্চিত করতে সম্পত্তির দলিল, আর্থিক লেনদেনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের একাংশের দাবি, সাবেক পরিবেশমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ ও সাবেক বন উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহারের রাজনৈতিক প্রভাব তাঁর প্রশাসনিক অবস্থানকে শক্তিশালী করেছিল। অতীতে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর যথাযথ তদন্ত হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখারও দাবি জানানো হয়েছে।
হোসাইন মুহাম্মদ নিশাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে তাঁকে পাওয়া যায়নি। একই বিষয়ে প্রধান বন সংরক্ষক আমিন হোসাইন চৌধুরীর বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
পরিবেশ ও বনসম্পদ রক্ষায় নিয়োজিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের দাবি, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অভিযোগগুলো যাচাই করা হোক।
একই সঙ্গে অভিযুক্ত কর্মকর্তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ, চেকপোস্টের অর্থ আদায়, নিয়োগ ও বদলি প্রক্রিয়া এবং বনভূমি দখলসংক্রান্ত অভিযোগ তদন্ত করে প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।